হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

স্ক্রিনে চোখ, সম্পর্কে দূরত্ব: জেনে নিন ফাবিং এবং সম্পর্কের অদৃশ্য দেয়ালের গল্প

ফিচার ডেস্ক

প্রযুক্তির যুগে ফাবিং হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে কিছু গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। ছবি: পেক্সেলস

প্রিয় মানুষটি সামনে বসে গল্প করছেন, আর আপনি একমনে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল ঘষে চলেছেন। দৃশ্যটি ইদানীং খুবই পরিচিত। প্রথম দর্শনে এটি নির্দোষ বা স্বাভাবিক অভ্যাস মনে হতে পারে। তবে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই আচরণের একটি সুনির্দিষ্ট নাম রয়েছে। একে বলা হচ্ছে ফাবিং। ফোন এবং স্নাবিং বা উপেক্ষা করা এই দুই শব্দের মেলবন্ধনে তৈরি শব্দটি। এটি দিয়ে মূলত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে উপস্থিত থেকে তাঁকে অবহেলা করে ফোনে বিভোর থাকার প্রবণতাকে বোঝায়। এর কাছাকাছি আরেকটি টার্ম হলো টেকনোফারেন্স। এটি নিয়মিত নোটিফিকেশন বা কলের কারণে সম্পর্কের সময়গুলোতে বিঘ্ন ঘটানোকে নির্দেশ করে। প্রযুক্তির এই নির্বিচার ব্যবহার আধুনিক দাম্পত্য ও প্রেমের সম্পর্কে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্ত দেয়াল তুলে দিচ্ছে।

মানুষ কেন ফাবিং করে

প্রযুক্তির যুগে ফাবিং হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে কিছু গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। সেসব কারণের মধ্যে আছে—

স্মার্টফোন ও গ্যাজেট আসক্তি: সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন অ্যাপ আমাদের তাৎক্ষণিক আনন্দ বা স্টিমুলেশন দেয়। এই ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশনের কারণে মানুষ সামনাসামনি যোগাযোগের চেয়ে ডিজিটাল স্ক্রিনকে বেশি প্রাধান্য দেয়।

ফোমো: অনলাইনে কে কী পোস্ট করল বা ডিজিটাল দুনিয়ায় নতুন কী ঘটল, তা দ্রুত না দেখলে কী যেন মিস হয়ে গেল। এই মানসিক উদ্বেগ বা ফোমো মানুষকে সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে বুঁদ করে রাখে।

সামাজিক দুশ্চিন্তা ও অস্বস্তি: সঙ্গীর সঙ্গে কোনো বিষয়ে জটিলতা বা আড্ডায় অস্বস্তি তৈরি হলে অনেকে মোবাইল ফোনকে একপ্রকার ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করেন। নিজেকে সাময়িকভাবে নিরাপদ বা ব্যস্ত প্রমাণ করতে তখন স্ক্রিনে চোখ রাখা হয়।

একঘেয়েমি বা ক্লান্তি: দীর্ঘদিনের চেনা আড্ডায় সামান্য একঘেয়েমি এলেই মানুষ নিজেকে বিনোদিত করার সহজ উপায় হিসেবে মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশনে ডুব দেয়।

সম্পর্কের ওপর এর বিষাক্ত প্রভাব

অনেকে মনে করেন সাময়িক ফোন দেখা কোনো ক্ষতিকর বিষয় নয়। কিন্তু বাস্তব ডেটা এবং মনোবিজ্ঞান ভিন্ন কথা বলে। ‘হিউম্যান বিহেভিয়ার অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজিস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ তার সঙ্গীর উপস্থিতিতে কাটানো সময়ের গড়ে প্রায় ২৭ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহারে ব্যয় করে। এমনকি শতকরা ৮৬ ভাগ মানুষ সঙ্গীর পাশে থেকেও প্রতিদিন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এই অভ্যাসের ফলে সম্পর্কে কিছু গভীর ক্ষত তৈরি হয়।

উপেক্ষিত হওয়ার যন্ত্রণা: পছন্দের মানুষের সামনে থেকেও যখন আপনি মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তখন অপর ব্যক্তিটি নিজেকে অদৃশ্য এবং গুরুত্বহীন মনে করতে শুরু করেন। এতে নিঃসঙ্গতা তৈরি হয়।

সম্পর্কের অবনতি ও মানসিক সমস্যা: নিয়মিত ফাবিং বৈবাহিক অসন্তোষ বাড়ায় এবং ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দম্পতির মধ্যে ফাবিংয়ের মাত্রা বেশি, তাঁদের মধ্যে বিষণ্নতা এবং জীবনের ওপর অসন্তোষের হারও বেশি। বিশেষ করে নারীদের ওপর এর নেতিবাচক মানসিক প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়।

মানুষ তার সঙ্গীর উপস্থিতিতে কাটানো সময়ের গড়ে প্রায় ২৭ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহারে ব্যয় করে। ছবি: পেক্সেলস

ডিজিটাল প্রাইভেসির জটিলতা: প্রযুক্তির সীমান্ত নিয়ে কাপলদের মতবিরোধ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। ‘সিভিক সায়েন্স’-এর ডেটা অনুযায়ী, প্রায় ৫২ শতাংশ আমেরিকান তাঁদের সঙ্গীর সঙ্গে লাইভ লোকেশন শেয়ার করেন। তবে প্রাইভেসির সীমা নির্ধারণ করা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সোশ্যাল মিডিয়ায় সঙ্গীর ছবি ট্যাগ করা, রিলেশনশিপ স্টেটাস দেওয়া, পরস্পরকে ট্র্যাক করা কিংবা পাসওয়ার্ড ভাগ করে নেওয়ার মতো বিষয়ে দুই সঙ্গীর দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হলে সেখানেও ফাটল ধরে।

যেভাবে কাটিয়ে উঠবেন এই সংকট

মোবাইল ফোনের রঙিন স্ক্রিন থেকে চোখ ফিরিয়ে প্রিয় মানুষটির চোখের দিকে তাকানোর অভ্যাসই পারে আপনার সম্পর্কের রসায়নকে আবার আগের মতো প্রাণবন্ত করে তুলতে। প্রযুক্তিকে জীবন থেকে একদম বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে কিছু সুস্থ ও ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলে ফাবিংয়ের এই চক্র ভেঙে ফেলা যায়।

খোলামেলা ও স্পষ্ট আলোচনা: আপনার সঙ্গীর ফাবিংয়ের কারণে আপনার কষ্ট হলে তা শান্তভাবে তাঁকে জানান। কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে দুজনে মিলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের কিছু সীমারেখা তৈরি করুন।

মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া: সঙ্গী মোবাইল ফোনে বুঁদ হয়ে পড়লে খোঁচা না দিয়ে গল্প শুরু করতে পারেন বা একসঙ্গে হাঁটার প্রস্তাব দিতে পারেন।

সহমর্মিতা ও সমঝোতা: একে অপরের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো জরুরি। ট্র্যাকিং অ্যাপ দিয়ে সারা দিন ট্র্যাক না করে ভ্রমণের সময় ছোটখাটো আপডেট দেওয়ার মতো মধ্যবর্তী কোনো সমঝোতায় আসা যায়। পাশাপাশি, সম্পর্কের খাতিরেও কেউ যেন নিজের গোপন পাসওয়ার্ড বা প্রাইভেসি বিসর্জন দিতে বাধ্য না হন, সে বিষয়ে সচেতন থাকুন।

প্রয়োজনে থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া: নিজেদের আলোচনায় কোনো ফল না এলে কিংবা বিরোধ বাড়লে কাপল কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

সূত্র: ইউরো নিউজ, আফ্রিকা নিউজ