হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

কেন পালিত হয় আন্তর্জাতিক গোসল দিবস? জেনে নিন গোসলের সঠিক নিয়ম

ফিচার ডেস্ক

গোসল একটি বৈশ্বিক অভ্যাস হলেও সংস্কৃতি ও জলবায়ু অনুযায়ী এর ধরনে রয়েছে বিশাল ভিন্নতা। তবে পানির অপচয় নিয়ে সচেতন থাকা জরুরি। ছবি: পেক্সেলস

অনেকেই বলেন বাথরুমে বসে নাকি সবচেয়ে সৃজনশীল বুদ্ধিটা মাথায় আসে। মনে আছে ছোটবেলায় শোনা বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের সেই গল্প। যেখানে বিজ্ঞানী এই মনীষী গোসলের টাবে নামতে গিয়েই পদার্থবিজ্ঞানের একটি যুগান্তকারী সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারগুলো যে শুধু গবেষণাগারেই হতো এমন নয়। আর্কিমিডিস গোসলখানায় আর নিউটন আপেলগাছের নিচে বসেই যুগান্তকারী সূত্রগুলো আবিষ্কার করেন। এ তো গেল গবেষণার গল্প। আপনি জানেন কি? আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গোসল দিবস। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত সাধারণ ও নিয়মিত একটি কাজ এই গোসল। তবে আজকের দিনটি কেবল শরীর পরিষ্কার করার দিন নয়। এটি একই সঙ্গে ইতিহাস উদ্‌যাপন, বিজ্ঞানের আনন্দ এবং নিজের শরীর ও মনের একটু বাড়তি যত্ন নেওয়ার দিন।

কেন ১৪ জুন আন্তর্জাতিক গোসল দিবস

প্রথমেই আর্কিমিডিসের কথা বলেছিলাম। কারণ, এই বিশেষ দিনটির পেছনে জড়িয়ে আছেন প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত এই গণিতবিদ ও বিজ্ঞানীর গল্পটি। খ্রিষ্টপূর্ব ২৮৭ অব্দে জন্মগ্রহণ করা এই মনীষী একদিন গোসলের টাবে নামতে গিয়েই লক্ষ করেন, যখনই তিনি পানির টাবে নামছেন, প্রতিবারই কিছু পানি উপচে মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে। এখান থেকেই তিনি বুঝতে পারেন যে কোনো বস্তুর আয়তন পানির নিচে ডুবিয়ে নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব। নিজের এই আবিষ্কারে এতটা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন যে টাব থেকে লাফিয়ে উঠে কোনো পোশাক ছাড়াই ‘ইউরেকা, ইউরেকা!’ (পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি!) চিৎকার করতে করতে সিরাকিউসের রাস্তা দিয়ে দৌড়েছিলেন। আর্কিমিডিসের সেই ঐতিহাসিক ‘ইউরেকা’র ক্ষণটিকে স্মরণ করেই প্রতিবছর ১৪ জুন এই মজাদার ও শিক্ষণীয় দিনটি উদ্‌যাপন করা হয়।

ইতিহাসের পাতায়

আজকাল আমরা ঘরে ঘরে আরামদায়ক বাথরুম, শাওয়ার কিংবা আধুনিক বাথটাব দেখলেও একসময় এত সহজ ছিল না। ইতিহাসের প্রথম বাথরুমের সন্ধান পাওয়া যায় সিন্ধু সভ্যতা বা ইন্ডাস ভ্যালি সিভিলাইজেশনে। যা খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের দিকের সময়। তবে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি ১৫৪৬ সালের দিকে সব পাবলিক বাথহাউস বা গণগোসলখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। বর্তমানে আমরা বিভিন্ন ধরনের সাবান ব্যবহার করি। মধ্যযুগে রোমান সাম্রাজ্যে চর্বি দিয়ে তৈরি প্রথম সাবানের ব্যবহার শুরু হয়। ১৭৬৭ সালে উইলিয়াম ফিথাম নামক এক ব্যক্তি ইংল্যান্ডে প্রথম আধুনিক শাওয়ার আবিষ্কার করেন। তবে উনিশ শতকের ইংল্যান্ডেও গোসল করা বেশ ঝক্কির বিষয় ছিল। তখন কোনো প্লাম্বিং ব্যবস্থা ছাড়া অগ্নিকুণ্ডের সামনে একটি বড় ঠান্ডা ধাতব পাত্র রেখে গোসল সারতে হতো। ১৮৮৩ সালে অস্ট্রিয়ান অভিবাসী ও দূরদর্শী ব্যবসায়ী জন মাইকেল কোহলার ঘোড়াকে খাবার দেওয়ার লোহার পাত্রের নিচে চারটি আলংকারিক পা যুক্ত করে এবং এনামেল ফিনিশ দিয়ে পৃথিবীর প্রথম আধুনিক বাথটাব আবিষ্কার করেন।

বিশ্বজুড়ে গোসলের বৈচিত্র্য ও দেশের সংস্কৃতি

গোসল একটি বৈশ্বিক অভ্যাস হলেও সংস্কৃতি ও জলবায়ু অনুযায়ী এর ধরনে রয়েছে বিশাল ভিন্নতা। আইসল্যান্ডের ভূতাপীয় পুল থেকে শুরু করে জাপানের ঐতিহ্যবাহী ‘অনসেন’। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গোসলের নিজস্ব আচার রয়েছে। জাপানের অনসেনগুলোর পানি প্রাকৃতিকভাবে অন্তত ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম হতে হয় এবং তাতে ১৯ ধরনের খনিজ থাকা বাধ্যতামূলক। এগুলো পেশির ব্যথা ও মানসিক চাপ কমায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের গোসলের অভ্যাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন চিত্র। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শাওয়ার নেওয়া দেশ হলো ব্রাজিল। আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে এখানকার ৯৯ শতাংশ মানুষ দিনে অন্তত দুবার, অর্থাৎ সপ্তাহে ১৪ বার শাওয়ার নেন। শাওয়ার নেন বলতে বোঝায় শাওয়ারে গোসল করেন। তবে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ বাথটাব পছন্দ করে। এদিকে বাথটাব ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে যুক্তরাজ্য। এখানকার ৩২ শতাংশ মানুষ শাওয়ারের চেয়ে বাথটাবে গোসল বেশি পছন্দ করে। জার্মানির ৯২ শতাংশ মানুষ শাওয়ার এবং ২০ শতাংশ বাথটাব ব্যবহার করে। অন্যদিকে চীনের ৮৫ শতাংশ মানুষ দ্রুততা ও জায়গার স্বল্পতার কারণে শাওয়ার পছন্দ করে এবং মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ বাথটাব বেছে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ শতাংশ মানুষ শাওয়ার নিলেও ১৩ শতাংশ মানুষ বাথটাব ব্যবহার করে। যা সংখ্যার বিচারে কম নয়।

সঠিক উপায়ে গোসল বা শাওয়ার নেবেন যেভাবে

ডার্মাটোলজিস্ট বা ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে, গোসল বা শাওয়ার নেওয়ার কিছু সঠিক নিয়ম রয়েছে, যা আমাদের ত্বক ও চুল ভালো রাখে। এর জন্য কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে।

পানির তাপমাত্রা: অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে গোসল করা একদমই উচিত নয়। এতে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। সব সময় হালকা গরম পানি ব্যবহার করা উচিত।

ধাপসমূহ: প্রথমে শরীর ভিজিয়ে নিয়ে ঘাড় ও কাঁধ থেকে শুরু করে পুরো শরীরে সাবান বা বডিওয়াশ মাখুন। পা ও পায়ের আঙুলের ফাঁকগুলোও পরিষ্কার করুন। চুল ধোয়ার সময় শ্যাম্পু মূলত স্ক্যাল্প বা মাথার তালুর দিকে বেশি খেয়াল করুন। এরপর কন্ডিশনার ব্যবহার করে চুলের শেষভাগে লাগান।

শেষ ধাপ: গোসল বা শাওয়ারের একদম শেষ মুহূর্তে শরীর ও চুলে সামান্য ঠান্ডা বা স্বাভাবিক পানি ঢালুন। এটি চুলের ফলিকল বন্ধ করতে এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করে।

ময়শ্চারাইজার: গোসল শেষ করে গা হালকা মুছে নেওয়ার পরপরই ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। কারণ, এটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে।

যা করবেন না

  • কখনো অতিরিক্ত স্ক্রাবিং বা গা জোরে ঘষবেন না।
  • আপনার লুফাহ বা স্ক্রাবার ব্যবহারের পর শুকিয়ে রাখুন। না হলে এতে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে।
  • সাধারণ বডিওয়াশ দিয়ে মুখ ধোবেন না। মুখের সংবেদনশীল ত্বকের জন্য ফেসওয়াশ ব্যবহার করাই শ্রেয়।
  • সাধারণত ৫ থেকে ১০ মিনিটের শাওয়ারই শরীর পরিষ্কারের জন্য যথেষ্ট।

গোসল দিবসের বিশেষ বার্তা

এই দিনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি।

পানির অপচয় রোধ: আমরা যখন তাপমাত্রা-নিয়ন্ত্রিত পানিতে আরামদায়ক গোসল উপভোগ করছি, তখনো পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের পরিষ্কার পানির নাগাল নেই। একটি টয়লেট প্রতিবার ফ্ল্যাশ করতেই ২৬ লিটার পানি খরচ হয়। তাই বিলাসী গোসল মাঝেমধ্যে করা গেলেও পানি অপচয় করা যাবে না।

ক্যানসারের ঝুঁকি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, ১৫০° ফারেনহাইট বা ৬৫° সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল বা তা পান করলে খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।

সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে কয়েকবার গোসল করাই যথেষ্ট। তবে প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার পর নিজের জন্য একটু সময় বের করে ১৪০-১৫০° ফারেনহাইট তাপমাত্রার আরামদায়ক পানিতে নিজেকে সতেজ করে তোলার জন্য আজকের দিনটি দারুণ একটি সুযোগ।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, হেলথ লাইন

‘ড্রাই বেগিং’ কি সম্পর্কের সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে? যেভাবে সামাল দেবেন

বয়সের ছাপ রুখতে কী খাবেন, কী খাবেন না

জেনে নিন, গরমে ত্বকের সমস্যা সমাধানে কতভাবে গোলাপজল ব্যবহার করা যায়

ফিটনেস রুটিনে পরিবর্তন আনার আগে জেনে নিন

ঘরে আম পাকানোর ৫টি প্রাকৃতিক উপায়

নিজের সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তায় আছেন? দেখে নিন, এ থেকে বাঁচতে কী করবেন

কর্মক্ষেত্রে কীভাবে ভিন্নমত জানাবেন? জানুন ৬ ম্যাজিক্যাল কৌশল

দাম্পত্য সম্পর্ক এবং সন্তানের মানসিক বিকাশ

ব্যবহৃত টি ব্যাগ না ফেলে যা করবেন

রাতে ঘুমানোর আগে পানি পানে আছে স্বাস্থ্যঝুঁকি