বিশ্ব বাঘ দিবস
বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় প্রাণী হলো বাঘ। শক্তি, ক্ষিপ্রতা, রাজকীয় সৌন্দর্য ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বের কারণে ১৯৭২ সালে এশিয়াটিক লায়ন বা সিংহকে সরিয়ে বেঙ্গল টাইগারকে ভারতের জাতীয় প্রাণী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। আজ ২৯ জুলাই (বুধবার) বিশ্ব বাঘ দিবস। বিশ্বজুড়ে বাঘের অস্তিত্বের সংকট রোধে ও সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে দিবসটি। বিশ্বব্যাপী সুন্দরবনের প্রতীক বাঘকে ঘিরে পালিত এই দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’।
বন বিভাগের ক্যামেরা ট্র্যাপিং ও জাতীয় জরিপগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যায় আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ২০১৪ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। পরে ২০১৮ সালের জরিপে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টিতে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপের তথ্য বলছে, সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি বাঘের অস্তিত্ব রয়েছে। বর্তমানে সুন্দরবনে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে বাঘের ঘনত্ব প্রায় ২ দশমিক ১৭টি। কিন্তু এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে বনাঞ্চল উজাড়, বাসস্থান সংকোচন, খাদ্যসংকট, চরম জলবায়ু পরিবর্তন ও রামপাল বা চোরাশিকারের মতো মারাত্মক কারণে বিশ্বজুড়ে বুনো বাঘের অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সফলতা ধরে রাখতে হলে বাঘের আবাসস্থল রক্ষা, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, চোরাশিকার দমন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের যুক্ত করা জরুরি।
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে বুনো বাঘের সংখ্যা ৫ হাজার ৪২১। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঘের আবাসস্থল ভারত। তথ্য অনুযায়ী, এখানে ৩ হাজার ১৬৭টি বুনো বাঘ রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে অবশিষ্ট বুনো বাঘের প্রায় ৫৮ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং মোট সংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ। দেশটিতে বার্ষিক প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে। রাশিয়ায় বুনো বাঘের সংখ্যা ৭৫০, যা মোট সংখ্যার প্রায় ১৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সুমাত্রান বাঘের আবাসস্থল ইন্দোনেশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ৩৯৩টি বুনো বাঘ রয়েছে, যা বিশ্বের মোট বাঘের ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। নেপালে বাঘের সংখ্যা ৩৫৫, যা বিশ্বের মোট বাঘের প্রায় ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। থাইল্যান্ডে ১৮৯টি বাঘ নিবন্ধিত রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে বুনো বাঘের ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে ন্যাশনাল পার্কে ক্যামেরা ট্র্যাপে অতি বিপন্ন ইন্দো-চায়নিজ বাঘের সন্ধান মেলে। ভুটানে পাহাড়ি অঞ্চলে তুষার চিতার সঙ্গে বসবাসকারী বাঘের সংখ্যা ১৫১, যা মোট বাঘের ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ১৫০টি বুনো বাঘ রয়েছে, যা মোট বৈশ্বিক বাঘের ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপে ১২৫টি বাঘের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে, যা বিশ্বের মোট বুনো বাঘের ২ দশমিক ৩১ শতাংশ। চীনে আমুর প্রজাতির বাঘের সংখ্যা মাত্র ১১৪, যা বিশ্ব বাঘের ২ দশমিক ১০ শতাংশ। মিয়ানমারে বাঘের সংখ্যা ২২, যা মোট বুনো বাঘের শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ।
ভিয়েতনামে মাত্র পাঁচটি বুনো বাঘ অবশিষ্ট রয়েছে। দেশটিতে ১৯৯৭ সালের পর আর কোনো বাঘের ছবি পাওয়া যায়নি। কম্বোডিয়ায় ২০০৭ সালের পর কোনো বুনো বাঘ দেখা যায়নি এবং দেশটি বাঘকে 'ফাংশনালি বিলুপ্ত' ঘোষণা করেছে। বর্তমানে ডব্লিউডব্লিউএফের সঙ্গে পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে লাওসে ২০১০ সালের গণনায় মাত্র ১৭টি বাঘ পাওয়া গেলেও বর্তমানে কোনো প্রজননক্ষম নারী বাঘ নেই বললেই চলে।
পৃথিবীতে বুনো বাঘের সংখ্যা ৫ হাজার ৪২১। এদিকে বন্দিদশায় থাকা বাঘের সংখ্যা আট হাজারের বেশি। এই সংখ্যার বৈষম্য একটি চরম বৈপরিত্য তৈরি করেছে। ১৯৭৩ সালে ভারতে ‘প্রজেক্ট টাইগার’ শুরু হয়েছিল নয়টি রিজার্ভ নিয়ে। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ টাইগার সামিটে ১৩টি রেঞ্জ কান্ট্রি ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে ২৯ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’ ঘোষণা করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইতিহাসজুড়ে বালি টাইগার, কাস্পিয়ান টাইগার, জাভান টাইগার ও টাইগার হাইব্রিড প্রজাতিগুলো ইতিমধ্যে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে সুন্দরবনসহ সারা বিশ্বের বুনো বাঘ ও তাদের আবাসস্থল টিকিয়ে রাখার কোনো বিকল্প নেই।
নজরকাড়া এই প্রজাতির একটি বিরল রূপ হলো সাদা বাঘ। সাদা বাঘ কিন্তু আলাদা কোনো প্রজাতি নয়, এটি মূলত বেঙ্গল টাইগারের একটি জিনগত মিউটেশন বা রূপান্তর। তাদের শরীরে ‘ফিওমেলানিন’ নামের রঞ্জক পদার্থের অভাব থাকায় গাঢ় বাদামি ডোরার মাঝে লালচে-কমলা রঙের বদলে সাদা পশম দেখা যায়। প্রাকৃতিক বনে এটি অত্যন্ত বিরল হলেও চিড়িয়াখানায় এর জনপ্রিয়তা থাকায় ইনব্রিডিং করা হয়। এটি সাদা বাঘের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।