হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

ইচ্ছাশক্তি নাকি অদৃশ্য জিন: আমাদের জীবন আসলে কার নিয়ন্ত্রণে

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

সামাজিক মেলামেশা ও সম্পর্ক ধরে রাখার ক্ষমতার পেছনেও জিনের হাত রয়েছে। ছবি: পেক্সেলস

আমাদের আচরণ, জীবনযাত্রার পছন্দ কিংবা দৈনন্দিন অভ্যাস—এগুলো আমরা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকি। কিন্তু সম্পূর্ণটাই কি আমরা নিয়ন্ত্রণ করি? এই বিষয়গুলো কিছুটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আর কিছুটা লুকিয়ে আছে শরীরের ভেতরের জিনের অদৃশ্য সংকেতে। দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো, আমাদের ব্যক্তিত্ব বা পছন্দ শুধু পরিবেশ ও লালনপালনের ফসল। তবে আধুনিক জিন গবেষণার বিকাশ প্রমাণ করছে, আমাদের চা কিংবা কফির পছন্দ, কোনো নির্দিষ্ট শখে জড়িয়ে পড়া, ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা সম্পর্কে মানিয়ে চলার মানসিকতা—সবকিছুর পেছনে আমাদের বায়োলজি বা জিনগত বৈশিষ্ট্যের এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে। এর মানে এই নয় যে ডিএনএ-ই আমাদের একমাত্র ভাগ্য। এটি বংশগত ঝোঁক এবং চারপাশের পরিবেশের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে আমাদের প্রকৃত চরিত্র ও জীবনপথ।

দৈনন্দিন পছন্দ ও শখের নেপথ্যে জিন

আমাদের প্রতিদিনের সাধারণ অনেক অভ্যাসের ওপর ডিএনএর প্রভাব রয়েছে। সেই প্রভাব পড়ে আচরণে, জীবনযাত্রায়।

প্রতিদিনের সাধারণ অনেক অভ্যাসের ওপর ডিএনএর প্রভাব রয়েছে। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

চা নাকি কফি

আমাদের স্বাদ গ্রহণের রিসিভারের জিনগত সূক্ষ্ম পার্থক্যের কারণে চা বা কফির দিকে আকৃষ্ট হই। যাঁরা কফি পছন্দ করেন, তাঁরা ক্যাফেইনের তিক্ততার প্রতি কম সংবেদনশীল। আর যাঁরা চা ভালোবাসেন, তাঁরা অন্য ধরনের তিতা স্বাদ তৈরির রাসায়নিক উপাদানকে ততটা তীব্রভাবে অনুভব করেন না।

শখ বা হবির জিন

১৫ বছর আগে যুক্তরাজ্যের ২ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর করা একটি জরিপে দেখা যায়, মানুষের শখের সঙ্গে তাঁদের পূর্বপুরুষদের পছন্দের গভীর সংযোগ রয়েছে। দেখা গেছে, বাগান করা, ডাকটিকিট জমানো বা কেক বানানোর মতো শখগুলো প্রজন্মান্তরে পরিবাহিত হতে পারে।

শব্দজট ও আগ্রহ

আইসল্যান্ডের ডি-কোড জেনেটিকসের প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী ক্যারি স্টেফানসন জানান, তাঁরা এমন এক জিন ভ্যারিয়েন্ট খুঁজে পেয়েছেন, যা নির্ধারণ করে একজন মানুষ ক্রসওয়ার্ড বা শব্দজটের ধাঁধা পছন্দ করবে কি না। তবে এই জিন শুধু আগ্রহ বাড়ায়, ধাঁধা সমাধানে কে কতটা দক্ষ হবে, তা নির্ধারণ করে না।

ব্যক্তিত্ব, দক্ষতা এবং জীবনের পথচলা

আমাদের মৌলিক ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলো; যেমন আমরা অন্তর্মুখী না বহির্মুখী, ঝুঁকি নিতে পছন্দ করি নাকি সাবধানি—সবকিছুর পেছনে জিনের বড় অবদান রয়েছে। নিউজার্সির রুটগার্স ইউনিভার্সিটির সাইকিয়াট্রির অধ্যাপক ড্যানিয়েল ডিকের মতে, অধিকাংশ ব্যক্তিত্বের উপাদানেরই জিনগত ভিত্তি রয়েছে।

গণিত, গান বা খেলাধুলায় দক্ষতা অর্জনে কিছু জিন ঝোঁক তৈরি করতে পারে। ছবি: পেক্সেলস

ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা

যাঁরা উদ্যোক্তা, সিইও বা অ্যাথলেট হন, তাঁরা জন্মগতভাবেই ঝুঁকি নিতে ভালোবাসেন। ড্যানিয়েল ডিকের ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষের ওপর করা এক গবেষণা অনুযায়ী, যাঁরা জন্মগতভাবে বেশি আবেগপ্রবণ বা ইমপালসিভ, শৈশবে তাঁদের এডিএইচডি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে এবং পরে তাঁদের ধূমপান, নেশাজাতীয় দ্রব্যে আসক্তি, মেদ বৃদ্ধি বা ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।

সৃজনশীলতা ও রোগ

স্টেফানসনের গবেষণা দেখিয়েছে, জিনগত গঠন মানুষকে সৃজনশীল চিন্তায় উৎসাহিত করে, তার প্রভাবে কিছু মানুষের মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া রোগের বিকাশ ঘটে।

দক্ষতা বনাম চর্চা

জার্মানির লাইপজিগের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা আরওবিও-১ নামক একটি জিনের সঙ্গে শিশুর গাণিতিক দক্ষতার সম্পর্ক খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন। তবে দেখা গেছে, গণিত, গান বা খেলাধুলায় দক্ষতা অর্জনে জিন শুধু ঝোঁক তৈরি করে; আসল দক্ষতা নির্ভর করে সঠিক অনুশীলন, প্রশিক্ষণ ও সুযোগের ওপর।

সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা ও ভালোবাসার জিন

আমাদের সামাজিক মেলামেশা ও সম্পর্ক ধরে রাখার ক্ষমতার পেছনেও জিনের হাত রয়েছে। ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষকেরা ১৭৮টি বিবাহিত দম্পতির ওপর এক গবেষণা চালান। জেন মহামারি বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রিউ দেওয়ানের মতে, মানুষ সাধারণত নিজের সঙ্গে জিনগত সামঞ্জস্য থাকা ব্যক্তিদেরই বন্ধু বা সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। অক্সিটোসিনকে বন্ডিং হরমোন বলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই হরমোনের প্রভাব বাড়ায় এমন জিন ভ্যারিয়েন্ট যাঁদের শরীরে অন্তত একজনের রয়েছে, তাঁরা সম্পর্কে কম দুশ্চিন্তায় ভোগেন এবং তাঁদের দাম্পত্যজীবন অনেক বেশি সুখী ও স্থায়ী হয়।

পরিবেশ যেভাবে জিনের প্রভাব বদলে দেয়

ডিএনএ আমাদের ভেতরে শুধু একটি প্রবণতা বা ঝোঁক তৈরি করে, কিন্তু পরিবেশ নির্ধারণ করে আমরা কীভাবে চলব। ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির সাইকিয়াট্রির অধ্যাপক সেসিলিয়া ফ্লোরেস জানান, একটি সুস্থ ও ইতিবাচক পরিবেশ মানুষের জিনগত ঝুঁকি প্রশমিত করতে পারে, এমনকি তা উল্টেও দিতে পারে। যারা জিনগতভাবে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতায় ভোগেন, তাঁরা ফাস্ট ফুডের দোকানের পাশে কাজ করলে ওজন বাড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। কিন্তু একটি স্থিতিশীল পরিবার, ভালো বন্ধু এবং নিয়মিত ব্যায়াম তাঁদের সেই খারাপ জিনগত প্রভাব কাটিয়ে সুস্থ জীবনযাপনে সাহায্য করে।

বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেছেন, আমাদের জিন ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় না, বরং পরিবেশ, সচেতনতা এবং মানসিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জিনগত যেকোনো প্রবণতা বদলে দেওয়া সম্ভব।

সূত্র: বিবিসি