ইংরেজি ক্যালেন্ডারের পাতায় যখন অক্টোবর, তখন বাংলা মাসের ঘরে আশ্বিন বসে আছে গা এলিয়ে। আশ্বিন মানে শরতের শেষ ভাগ। এ সময় আকাশজুড়ে সাদা মেঘের ভেলা আর কাশবন আমাদের মনে কিছুটা দোলা দিলেও ক্যালেন্ডারের পাতা যখনই ১ অক্টোবরে পৌঁছায়, অনেকের শরীর ও মনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সকালবেলা অ্যালার্ম বাজার পরও বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করে না, কর্মক্ষেত্রে সারা দিন একধরনের ঝিমুনি ভাব কাজ করে, আর কারণে-অকারণে মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে। হঠাৎ করে সবার মধ্যে এই যে ক্লান্তি, অলসতা আর মেজাজ পরিবর্তন ঘটতে থাকে; তাকে বিশেষজ্ঞরা বলেন ফল ফ্যাটিগ বা শরৎকালীন অবসাদ। কিন্তু কেন অক্টোবরের শুরু থেকে আমাদের শরীর ও মন এভাবে বদলে যেতে শুরু করে? এর পেছনে রয়েছে কিছু অবধারিত জৈবিক ও প্রাকৃতিক কারণ।
অক্টোবর থেকে দিন ছোট হতে শুরু করে এবং রাত বড় হয়। ফলে গ্রীষ্ম বা বর্ষাকালের চেয়ে সূর্যের আলোর পরিমাণ অনেক কমে যায়। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে আমাদের মস্তিষ্ক সূর্যালোকের ওপর ভিত্তি করে শরীর সজাগ রাখে। আলো যখন কমে যায়, তখন মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থি থেকে মেলাটোনিন নামক হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। এই মেলাটোনিন হলো মূলত ঘুমের হরমোন। সারা দিন শরীরে এর আধিক্য থাকার কারণে শরীর অলস লাগে এবং সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব থাকে।
সূর্যের আলো আমাদের শরীরে সেরোটোনিন নামক একটি নিউরোট্রান্সমিটার বা হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে, যা আমাদের মন ভালো রাখতে এবং শক্তি জোগাতে কাজ করে। অক্টোবরের শুরুতে রোদ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে সেরোটোনিন কমে যায় এবং একই সঙ্গে কমে যায় ভিটামিন ডি এর উৎপাদন। এই দুইয়ের অভাবে কোনো কারণ ছাড়াই মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, অবসাদ ভর করে এবং মানসিক উদাসীনতা দেখা দেয়।
আমাদের শরীরের ভেতর একটি অদৃশ্য ঘড়ি আছে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এটি আমাদের কখন জাগতে হবে আর কখন ঘুমাতে হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে। প্রকৃতির আলো-আঁধারির হঠাৎ পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরের এই অভ্যন্তরীণ ঘড়িটি সহজে তাল মেলাতে পারে না। হঠাৎ সকালে অন্ধকার থাকা বা বিকেলে দ্রুত রাত হয়ে যাওয়ার কারণে ঘুমের চক্র বিঘ্নিত হয়, যা দিনভর ক্লান্তির অন্যতম প্রধান কারণ।
অক্টোবরের শুরু থেকে আবহাওয়া বদলাতে শুরু করে। গরমের তীব্রতা কমে বাতাসে হালকা হিমেল ভাব আসে। এই ঋতু পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে বাতাসে নানা ধরনের ভাইরাস ও অ্যালার্জেন বেড়ে যায়। অনেক সময় আমরা পুরোপুরি অসুস্থ না হলেও আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেতরে-ভেতরে এই জীবাণুগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকে। এই অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের কারণে শরীর প্রচুর শক্তি হারিয়ে ফেলে, ফলে আমরা প্রচণ্ড ক্লান্তিবোধ করি।
সূত্র: নেচারপেডিক ও অন্যান্য