ঘুম পৃথিবীর সব মানুষের জীবনেরই অপরিহার্য অংশ। কিন্তু ঘুমানোর ধরন সব দেশে এক নয়। কোথাও দুপুরের ঘুম দিনের নিয়মিত অংশ, কোথাও আবার অফিসে একটু চোখ বন্ধ করাকে পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়। কোনো দেশে শিশুকে শীতের মধ্যেও বাইরে ঘুম পাড়ানো হয়, আবার কোথাও স্বামী-স্ত্রী একই বিছানায় ঘুমালেও ব্যবহার করেন আলাদা কম্বল। দেশ, আবহাওয়া, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের সঙ্গে বদলে যায় ঘুমের অভ্যাসও। চলুন, জেনে নিই বিশ্বের নানা দেশের এমন আটটি ভিন্ন ঘুমের রীতি।
স্পেনের ঘুমের সংস্কৃতির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে সিয়েস্তা। দিনের মাঝামাঝিতে কিছু সময়ের জন্য কাজ থেকে বিরতি নিয়ে বিশ্রাম বা ঘুমানোর এই রীতি বহুদিনের পুরোনো। সাধারণত দুপুরের খাবারের পরের সময়টিই ছিল এর জন্য উপযুক্ত। প্রচণ্ড গরমের সময় দিনে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার সঙ্গে এই ঐতিহ্যের সম্পর্ক রয়েছে। সিয়েস্তা শুধু ঘুম নয়, বরং দিনের ব্যস্ততার মাঝখানে শরীর ও মনকে একটু বিরতি দেওয়ার সংস্কৃতি। যদিও আধুনিক নগরজীবনে নিয়মিত দীর্ঘ সিয়েস্তার প্রচলন আগের তুলনায় কমেছে, তবু স্পেনের জীবনযাত্রার সঙ্গে শব্দটি এখনো গভীরভাবে যুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রে অনেকের কাছে পোষা প্রাণী পরিবারের সদস্য। তাই রাতের ঘুমের সময় অনেকে তাঁদের পোষা কুকুর বা বিড়ালকে নিজের কাছাকাছি রাখতে চান। আমেরিকান কুকুরের মালিকদের বড় একটি অংশ সোফা বা বিছানায় পোষা প্রাণীর সঙ্গে সময় কাটান। পোষ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনেকের কাছে মানসিক স্বস্তির কারণ। পরিচিত ও প্রিয় প্রাণীকে পাশে পেলে একাকিত্ব বা উদ্বেগ কম অনুভূত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ঘরে রাতের ঘুম মানে শুধু বিছানা ও বালিশ নয়, সঙ্গে থাকতে পারে তাঁদের পোষা প্রাণী।
শিশুর রাতের ভয় বা দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য গুয়াতেমালায় রয়েছে এক মিষ্টি ঐতিহ্য। ছোট ছোট হাতে তৈরি রঙিন পুতুল, যেগুলো ওয়ারি ডল নামে পরিচিত, অনেক সময় শিশুর বালিশের নিচে রাখা হয়। বিশ্বাসটি হলো, রাতে শিশুর মনে দুশ্চিন্তা বা ভয় এলে পুতুলটি সেগুলো নিজের কাছে নিয়ে নেয়। এটি মূলত একটি সাংস্কৃতিক বিশ্বাস এবং শিশুদের ঘুমের আগে মানসিক আশ্বাস দেওয়ার ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি।
জাপানে কর্মব্যস্ততার সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক বেশ জটিল। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও ব্যস্ত জীবনযাপনের কারণে সেখানে কর্মক্ষেত্রে অল্প সময়ের জন্য চোখ বন্ধ করা একেবারে অস্বাভাবিক বিষয় নয়। অফিসে দিনের মাঝখানে কেউ ঘুমিয়ে পড়লে সেটিকে সব সময় অলসতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ছোট ঘুমকে জাপানি সংস্কৃতিতে ইনেমুরি নামে পরিচিত একটি আচরণের সঙ্গে যোগ করা হয়। মানুষ কাজের জায়গাতেই অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নিয়ে প্রয়োজনমতো কাজে ফিরে যেতে পারে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ঘুমের সংস্কৃতির অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো, শিশুকে বাইরে রেখে ঘুম পাড়ানো। নর্ডিক দেশগুলোর কিছু পরিবারে শিশুকে গরম পোশাক পরিয়ে ঘরের বাইরে নির্দিষ্ট নিরাপদ পরিবেশে ঘুমাতে দেওয়ার রীতি রয়েছে। এমনকি শীতের সময়ও এই অভ্যাস দেখা যায়। শিশুকে বাইরে ঘুম পাড়ানোর পেছনে তাজা বাতাস ও ঠান্ডা পরিবেশের প্রতি সাংস্কৃতিক আস্থার কথা বলা হয়। অবশ্য আধুনিক সময়ে শিশুর নিরাপত্তা, তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও নর্ডিক সংস্কৃতিতে এটি একেবারে পরিচিত দৃশ্য।
মেক্সিকোর অনেক মানুষের রাতের রুটিনে ঘুমানোর আগে প্রার্থনা বা ধ্যানের জায়গা রয়েছে। দিনের ব্যস্ততা শেষ করে কিছু সময় নীরব থাকা, প্রার্থনা করা কিংবা নিজের ভেতরের চিন্তাগুলো শান্ত করার এই অভ্যাস রাতের রুটিনকে একটি আধ্যাত্মিক শান্তি দেয়। ঘুমের প্রস্তুতি এখানে শুধু বিছানায় যাওয়ার বিষয় নয়; মানসিকভাবে নিজেকে শান্ত করাও এর অংশ।
একসঙ্গে ঘুমালেও একই কম্বল ব্যবহার করতে হবে, এমন নিয়ম নেই জার্মানিতে; বরং দম্পতিদের মধ্যে আলাদা কম্বল ব্যবহারের রীতি বেশ পরিচিত। একই বিছানায় দুজন থাকলেও প্রত্যেকের জন্য আলাদা কম্বল থাকে। এর সুবিধাও বেশ বাস্তব। একজন যদি বেশি কম্বল টেনে নেন বা অন্যজনের তুলনায় বেশি গরম অনুভব করেন, তাহলে ঘুমের ব্যাঘাত হয়। এই রীতি শুধু জার্মানিতেই সীমাবদ্ধ নয়; অস্ট্রিয়া ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কিছু দেশেও আলাদা ডুভে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।
ব্রাজিলের ছোট শহর বায়েপেন্দির একটি সম্প্রদায়ের ঘুমের অভ্যাস আধুনিক ব্যস্ত জীবন থেকে বেশ আলাদা। সেখানকার মানুষের ঘুমের সময়সূচিতে শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের জীবনযাপনের কিছু বৈশিষ্ট্য টিকে ছিল। তাঁরা সাধারণত রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘুমাতে যেতেন এবং সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ঘুম থেকে উঠতেন। এই ধরনের নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি আধুনিক স্ক্রিননির্ভর জীবনযাপনের তুলনায় অনেক বেশি স্থির।
সূত্র: সানডে সিটিজেন