কনকনে ঠান্ডা, মুষলধারে বৃষ্টি কিংবা বরফে ঢাকা চারপাশ। নরওয়ের মানুষদের কাছে এমন আবহাওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, ঘরের দরজা খুলে প্রকৃতির মাঝে বেরিয়ে পড়া নরওয়েজিয়ানদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের জীবনের এই বিশেষ দর্শনটির নাম ‘ফ্রিলুফৎসলিভ’। নরওয়েজিয়ান এই শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘মুক্ত বাতাসের জীবন’। তবে তাদের কাছে এটি কেবল একটি শব্দ নয়। এটি মানসিক শান্তি, সামাজিক মেলবন্ধন এবং সুস্থ থাকার এক জীবনধারা। যান্ত্রিক এই যুগে প্রকৃতির সঙ্গে আবার নতুন করে সংযোগ স্থাপন করা এবং জীবনের গতি কিছুটা ধীর করে দিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করাই হলো ফ্রিলুফৎসলিভের আসল শিক্ষা। তাই যান্ত্রিক জীবনের চাপ থেকে নিজেকে একটু শান্তি দিতে আপনিও চর্চা করতে পারেন ফ্রিলুফৎসলিভ।
১৮৫০-এর দশকে বিখ্যাত নরওয়েজিয়ান নাট্যকার হেনরিক ইবসেন প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি প্রকৃতির নির্জনতায় সময় কাটানোকে মানসিক ও আত্মিক সুস্থতার অন্যতম উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা এই জীবন দর্শন নরওয়ের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিশে গেছে। ফ্রিলুফৎসলিভ বলতে কেবল পাহাড় চড়া, স্কি করা বা কায়াকিং করাকেই বোঝায় না। বনের মধ্যে চুপচাপ বসে পাখির ডাক শোনা, বুনো ফল কুড়ানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পফায়ার জ্বালিয়ে সময় কাটানো—সবই এই দর্শনের অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না করে এর স্বাভাবিক সৌন্দর্য উপভোগ করাই ফ্রিলুফৎসলিভের মূল কথা।
নরওয়েতে শৈশব থেকেই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা দেওয়া হয়। কনকনে শীতের মধ্যেও সেখানকার নার্সারিগুলোতে ছোট শিশুদের প্রামে ঘুম পাড়িয়ে খোলা বাতাসে রাখা হয়। প্রি-স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনের শিশুরা দিনের প্রায় ৮০ শতাংশ সময় প্রকৃতির মাঝে কাটায়। স্কুলেও রয়েছে বিশেষ দিন। যেই দিনগুলোতে বাচ্চাদের বনজঙ্গলে নিয়ে গিয়ে তাঁবু খাটাতে বা আগুন জ্বালাতে শেখানো হয়। এমনকি সেখানে ফ্রিলুফৎসলিভের ওপর ব্যাচেলর ডিগ্রি নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটালে উদ্বেগ ও চাপ কমে এবং মন সতেজ হয়। ২০২০ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ নরওয়েজিয়ান প্রকৃতিতে সময় কাটানোর পর নিজেদের চাপমুক্ত ও ভালো মেজাজে অনুভব করেন। প্রকৃতির মাঝে থাকার ফলে মানসিক বিষণ্নতা কমে এবং মনোসংযোগ বাড়ে। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’-এ বিশ্বজুড়ে নরওয়ে যে অন্যতম সুখী দেশের তালিকায় শীর্ষ সারিতে থাকে। এর অন্যতম কারণ এই ফ্রিলুফৎসলিভ। এটি মানুষকে দৈনিক মানসিক চাপ থেকে দূরে রেখে মানসিক প্রশান্তি যোগায়।
নরওয়েতে ১৯৫৭ সালে ‘ফ্রি-এয়ার অ্যাক্ট’ নামক একটি আইন পাস হয়। এর মাধ্যমে যেকোনো নাগরিকের ভূমির মালিকানা নির্বিশেষে মুক্ত প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়ানো, তাঁবু ফেলা এবং ফল বা মাশরুম কুড়ানোর আইনি অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই অধিকারের পাশাপাশি দায়িত্বও রয়েছে। তা হলো প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না করা এবং কোনো আবর্জনা না ফেলে আসা।
নরওয়েতে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে—‘খারাপ আবহাওয়া বলতে কিছু নেই। পোশাক নির্বাচনই ভুল হতে পারে।’ শীতকালে যখন দিন ছোট হয়ে আসে এবং তীব্র ঠান্ডা পড়ে, তখনো তারা ঘরে বসে থাকে না। বরফে স্কি করা বা হিমশীতল লেকে মাছ ধরার মতো কার্যক্রমে অংশ নিয়ে তারা শীতকালকেও দারুণভাবে উপভোগ করে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ভিজিট নরওয়ে