সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করার সময় হুট করে চোখের সামনে বিভিন্ন উদ্ভট বা হাসির ভিডিও ভেসে আসে। সেখানে কেউ হয়তো ক্যাফেতে হাঁটতে গিয়ে কফি ফেলে দিচ্ছে বা কেউ কোনো অনুষ্ঠানে বেসুরো গলায় গান গাইছে। কেউবা অতিরিক্ত কেঁদে-কেটে পোস্ট করেছে নিজের ভিডিও। এমন ভিডিও দেখে আমরা একই সঙ্গে লজ্জা ও অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যাই আবার আনন্দও পাই। একে এককথায় বলা হয় ক্রিঞ্জ। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে, অস্বস্তি লাগলেও আমরা সেই ভিডিও থেকে চোখ সরাতে পারি না। উল্টো পুরোটা দেখার পর আরও এমন ভিডিও খুঁজতে থাকি। কিন্তু কেন অন্যের এই লজ্জা বা অস্বস্তিকর মুহূর্ত আমাদের এভাবে স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখে? এটা কখনো ভেবে দেখেছেন?
এই সব ভিডিওর কথা মনে হলেও আমাদের রাগ হয়। তারপরেও আমরা এগুলো সামনে এলে শেষ পর্যন্ত দেখি। ঠিক কী কারণে আমরা এসব দেখি? মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অনুভূতিকে বলা হয় সেকেন্ডহ্যান্ড বা ভিকারিয়াস এমবারাসমেন্ট। সহজ কথায়, অন্যের লজ্জাজনক কাণ্ড দেখে নিজে লজ্জা পাওয়া। আমাদের মস্তিষ্ক অন্যের আবেগ অনুকরণ করতে পারে। যখন আমরা অন্য কাউকে কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে দেখি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের ব্যথা ও অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে অন্যজন হয়তো লজ্জা না-ও পেতে পারে। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক কল্পনা করে নেয়, ওই পরিস্থিতিতে সে থাকলে কতটা লজ্জিত হতো। একেই আমরা এমপ্যাথি বা সহানুভূতি বলি। এই সামাজিক সহানুভূতির কারণেই অন্য কেউ বিব্রত হলে নিজেদের শরীরে আঁচ লাগা, অস্বস্তি হওয়া কিংবা একটু দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ক্রিঞ্জ ভিডিও দেখার অভ্যাসটি অনেকটা জাঙ্ক ফুড খাওয়ার মতো। আমরা জানি, জাঙ্ক ফুড শরীরের জন্য খুব একটা ভালো নয়। তবু সেসব খাবার খাওয়ার পর আবারও খাওয়ার ইচ্ছে জাগে। ক্রিঞ্জ ভিডিও আমাদের মস্তিষ্কে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এ কারণে ইন্টারনেটে ক্রিঞ্জ রিঅ্যাকশন চ্যানেল বা কমপিলেশন ভিডিওগুলোর এত চাহিদা।
মানুষ সামাজিক প্রাণী। সমাজ থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার বা অন্যদের কাছে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হওয়ার ভয় মানুষের মধ্যে গভীর। যখন কেউ প্রকাশ্যে কোনো সামাজিক নিয়ম ভাঙেন, তখন লজ্জা বা অস্বস্তি একটি ইমোশনাল ব্যারোমিটার হিসেবে কাজ করে। এটি নির্দেশ করে, কোনো একটি নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে। তবে গবেষকেরা বলছেন, লজ্জা প্রকাশ করার কিন্তু একটি ভালো দিকও রয়েছে। এটি সমাজকে একটি বার্তা দেয়, ‘আমি একটি অনভিপ্রেত বা বোকামি কাজ করে ফেলেছি এবং আমি বুঝি যে এটি ভুল ছিল।’ এই লজ্জিত হওয়ার অনুভূতি পর্যবেক্ষণকারীর মনে একটি বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করে এবং তার মধ্যে সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে।
ক্রিঞ্জ কনটেন্টের প্রতি এই তীব্র আকর্ষণের পেছনে শুধু সহানুভূতিই একমাত্র কারণ নয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে শাডেনফ্রয়ডে বা অন্যের বিপদে বা লজ্জিত হওয়া দেখে মনে মনে আনন্দ পাওয়ার অনুভূতিও কাজ করে। যদি ক্রিঞ্জ দেখার পেছনে শুধু সহানুভূতিই কাজ করত, তাহলে টানা এমন ভিডিও দেখলে মানুষ মানসিকভাবে খারাপ বোধ করত এবং ভিডিও দেখা বন্ধ করে দিত। কিন্তু মানুষ তা করে না। কারণ, অন্যের এই সামাজিক ভুলগুলো দেখে অনেক সময় একধরনের স্বস্তি বা গোপন পরিতৃপ্তিও পাওয়া যায়।
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তৈরি হওয়া পরোক্ষ লজ্জা বা সেকেন্ডহ্যান্ড এমবারাসমেন্ট সামলে ওঠার উপায়গুলো তিনটি ধাপে ভাগ করেছেন ক্লিনিক্যাল হেলথ সাইকোলজিস্ট ড. মেরিয়েল কলিন্স। সেগুলো হলো—
সহজভাবে নেওয়া
পরোক্ষ লজ্জা পাওয়ার অর্থ হলো আপনার ভেতরে অন্য মানুষের আবেগ অনুভব করার মতো সহানুভূতি রয়েছে। এই অস্বস্তিকর অনুভূতিকে ‘খারাপ’ বা বাজে হিসেবে দেখা উচিত নয়। নিজের আবেগ হিসেবে বিচারহীনভাবে মেনে নিয়ে তা পার হতে দেওয়া উচিত।
স্টপ টেকনিক ব্যবহার করা
হঠাৎ তীব্র অস্বস্তি দেখা দিলে চার ধাপে গঠিত এই পদ্ধতি কার্যকর। স্টপের ‘এস’ বর্ণটি দিয়ে বোঝানো হয় স্টপ। অর্থাৎ চিন্তার স্রোত থামাতে একমুহূর্তের জন্য থামুন। এরপর ‘টি’ বর্ণ দিয়ে টেক আ ব্রেথ অর্থাৎ গভীরভাবে শ্বাস নিন। এতে হার্টবিট কমে শরীর ও মন শান্ত হয়। ‘ও’ দিয়ে বোঝায় অবজার্ভ অর্থাৎ শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলো বিচার ছাড়াই কৌতূহল নিয়ে পর্যবেক্ষণ করুন। আর ‘পি’ বর্ণ দিয়ে বোঝায় প্রসেসড মাইন্ডফুলি। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হতে হেঁটে আসা। মন ঘুরিয়ে নেওয়া বা নিজেকে সময় দেওয়ার মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া।
পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও প্রতিক্রিয়া জানানো
আপনার প্রতিক্রিয়া যদি ওই ব্যক্তির নজরে পড়ে যায় বা পরিবেশ বিব্রতকর করে তোলে, তবে খোলামেলা কথা বলুন। তাঁর অনুভূতি কেমন তা বুঝে সহানুভূতি জানান এবং নিজের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ভুল-বোঝাবুঝি দূর করুন। ক্রিঞ্জ বা অন্যের লজ্জায় অস্বস্তি বোধ করা আমাদের মনস্তত্ত্বেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি জানায়, আমরা সামাজিক নিয়ম সম্পর্কে সচেতন এবং অন্যের প্রতি আমাদের সহানুভূতি আছে। এই অনুভূতির কারণেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রিঞ্জ কনটেন্টের এই অদ্ভুত ও অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তা।
সূত্র: ডয়চে ভেলে, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক