সম্প্রতি এক তারকা দম্পতির বিচ্ছেদ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চলছে নানা জল্পনা। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, সংসার ভাঙে বড় কোনো আঘাতে নয়, জমে থাকা ছোট ছোট অবহেলায়। এককথায় সংসার এক দিনে ভাঙে না; ভাঙে প্রতিদিনের না বলা কথায়।
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যান নবদম্পতিদের টানা ছয় বছর পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বড় ঝগড়ায় নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় ছোট ছোট মুহূর্তে।
জনপ্রিয় সেই তারকা দম্পতি জানিয়েছেন, তাঁরা আলাদা হয়ে যাচ্ছেন। খবরটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক মাধ্যমে যেন আদালত বসে গেল। কেউ তৃতীয় কোনো মানুষের খোঁজে নামলেন, কেউ দায় চাপালেন খ্যাতির ঘাড়ে, কেউবা একবাক্যে রায় দিলেন, ‘এখনকার ছেলেমেয়েরা মানিয়ে নিতে জানে না।’ অথচ তাঁদের ব্যক্তিগত কারণ খোঁজা আমাদের কাজ নয়; সেটি তাঁদের মর্যাদার প্রশ্ন। আমাদের ভাবার বিষয় বরং তাঁদের উচ্চারিত একটি শব্দ; তা হলো—বোঝাপড়া। এই ‘বোঝাপড়া’ শব্দটি ছোট হলেও এর শিকড় কিন্তু অনেক গভীরে। আসলেই কি সবার কথামতো নতুন প্রজন্ম অল্পেই হাঁপিয়ে উঠছে, হয়ে উঠছে ধৈর্যহারা? কেন ভাঙছে সংসার? জেনে নিন কয়েকটি কারণ।
আমরা ধরে নিই, বিয়ের আগে ভালো করে চিনলেই সংসার টিকে যাবে। কিন্তু প্রেমের মানুষ আর সংসারের মানুষ সব সময় এক নয়। প্রেমে আমরা একে অপরের সবচেয়ে সুন্দর সময়টুকু দেখি। সংসারে দেখি সবচেয়ে ক্লান্ত সময়টা, যখন মাসের হিসাব মেলে না, অফিস থেকে ফিরে কথা বলার শক্তিটুকুও থাকে না, আর দুই পরিবারের প্রত্যাশা দুই দিক থেকে টানতে থাকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনা জরিপের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে প্রতি হাজারে বিবাহবিচ্ছেদের হার শূন্য দশমিক ৭ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৪-এ দাঁড়িয়েছিল, যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৩ সালে তা কিছুটা কমে ১ দশমিক ১ হয়েছিল। রাজধানীর চিত্র আরও স্পষ্ট; শুধু ২০২২ সালেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে তালাকের আবেদন জমা পড়েছিল ১৩ হাজার ২৮৮টি, অর্থাৎ গড়ে প্রায় প্রতি ৪০ মিনিটে একটি আবেদন জমা পড়েছিল! এই হিসাব সব বয়সের মানুষের, তরুণদের আলাদা করে নয়।
তবে চেম্বারে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আসেন বিয়ের প্রথম কয়েক বছরের দম্পতিরাই। এই প্রবণতাকে শুধু ‘নৈতিক অবক্ষয়’ বলে চালিয়ে দেওয়া অন্যায় হবে। নারীরা আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী; অসুখী সম্পর্কে আজীবন মুখ বুজে থাকাকে তাঁরা আর ‘ধৈর্য’ বলে মেনে নিচ্ছেন না। ঢাকার ওই আবেদনগুলোর বেশির ভাগ এসেছে স্ত্রীদের কাছ থেকে। কিছু বিচ্ছেদ সত্যিই মুক্তি। কিন্তু সব বিচ্ছেদ তো মুক্তি নয়। যে সংসারগুলো সময়মতো একটু মনোযোগ পেলে বেঁচে যেতে পারত, সেগুলোর দায় কার কাঁধে বলুন তো!
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দম্পতিদের মুখে বড় অভিযোগ থাকে না; বরং শোনা যায় এমন সব কথা—‘আমি কথা বলি, আর ও ফোন স্ক্রল করে’, ‘মেসেজ সিন করে, কিন্তু উত্তর দেয় না’, ‘ঝগড়ার পর তিন দিন কথা বন্ধ থাকে’, ‘ঘরের সব কাজ আমি একাই করি, কেউ টেরও পায় না।’ শুনতে খুব সাধারণ, তাই না? কিন্তু সাধারণ বলেই কি এগুলো নিরীহ?
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যান নবদম্পতিদের টানা ছয় বছর পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বড় ঝগড়ায় নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় ছোট ছোট মুহূর্তে। ধরুন, একজন বললেন, ‘দেখো, আজ আকাশটা কী সুন্দর!’ অন্যজন হয় সাড়া দেন, নয়তো এড়িয়ে যান। যাঁদের সংসার টিকে ছিল, তাঁরা এমন ছোট ডাকের ৮৬ শতাংশে সাড়া দিতেন; আর যাঁদের সংসার ভেঙেছিল, তাঁরা সাড়া দিতেন গড়ে মাত্র ৩৩ শতাংশে। ভালোবাসা তাই এক দিনে ফুরিয়ে যায় না; জমতে থাকা অবহেলায় তা নিঃশব্দে ক্ষয়ে যায়, যে ক্ষয় চোখেই পড়ে না।
আজকের তরুণ দম্পতিরা এমন কিছু চাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন, যা আগের প্রজন্মের ছিল না। সামাজিক মাধ্যমে অন্যের সংসারের বাছাই করা ছবি দেখে নিজের সাদামাটা দিনগুলোকে ব্যর্থ মনে হয় তাঁদের কাছে। কোনো অ্যাপ ঠিকমতো না চললে মুছে ফেলার যে অভ্যাস, তাই অজান্তে ঢুকে পড়ে সম্পর্কেও। আবার একজন সঙ্গীর কাছেই প্রত্যাশা থাকে, তিনি একাধারে বন্ধু, প্রেমিক, পরামর্শদাতা আর ক্যারিয়ারের সহযোদ্ধা হবেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো এক ঘাটতি। আমাদের পরিবারে ঝগড়া হয় দরজা বন্ধ করে, নয়তো একেবারেই হয় না; ঝগড়ার পর আবার কাছে ফেরার কৌশল কেউ শেখায় না। সংসারের টাকা কে কীভাবে খরচ করবেন, সন্তান কবে আসবে, কার ক্যারিয়ার অগ্রাধিকার পাবে, দুই পরিবার কতখানি জড়াবে—এসব প্রশ্ন বিয়ের আগে কেউ তোলেন না। অথচ বিয়ের পর এগুলোই হয়ে ওঠে প্রতিদিনের প্রশ্ন।
বিচ্ছেদ সব সময় ব্যর্থতা নয়; কখনো কখনো দুজন মানুষের জন্য সেটিই সবচেয়ে সৎ সিদ্ধান্ত। আলোচিত ওই দম্পতি যেভাবে পরস্পরের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান বজায় রেখে বিদায় নিয়েছেন, তা-ও একধরনের শিক্ষা। সম্মান রেখে আলাদা হওয়াও কি পরিণত ভালোবাসার একটি রূপ নয়? আর যে সংসারগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলো বাঁচাতে বিপ্লব লাগে না; লাগে কয়েকটি ছোট অভ্যাস।
শরীর খারাপ হলে আমরা নির্দ্বিধায় চিকিৎসকের কাছে যাই; তাহলে সম্পর্ক অসুস্থ হলে সাহায্য চাইতে এত দ্বিধা কেন?
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি
ছবি: পেক্সেলস