আকাশে হঠাৎ মেঘের ঘনঘটা, একটু পরেই ঝুম বৃষ্টি। আবার পরক্ষণেই হাঁসফাঁস করা ভ্যাপসা গরম। আবহাওয়া পরিবর্তনের এমন দিনে বৃষ্টিতে ভেজা বা ঘাম বসে ঠান্ডা লাগা এখন ঘরে ঘরে সাধারণ ঘটনা। তবে জ্বরে আক্রান্ত দিনগুলো পার করে যখন শরীর একটু সুস্থ হতে শুরু করে, তখনই সামনে আসে আরেক বড় দায়িত্ব। নিজের থাকার ঘর ও ব্যবহৃত চারপাশ পুনরায় পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত করা তখন প্রধান কাজ হয়ে ওঠে। কারণ, রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও তাঁর চারপাশে ভাইরাসের অস্তিত্ব থেকে যায় অনেকটা সময়। ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লুর ভাইরাস মানুষের হাতে মাত্র পাঁচ মিনিটের মতো বাঁচলেও ঘরের শক্ত যেকোনো জিনিসের নিচে কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় ও সংক্রামক থাকতে পারে। তাই নিজে সুস্থ হওয়ার পর পরিবারের অন্য সদস্য কিংবা ভালোবাসার মানুষদের সুরক্ষিত রাখতে ঘরদোর জীবাণুমুক্ত করা জরুরি।
অনেকের একটি ভুল ধারণা আছে, সরাসরি ডিসইনফেক্টেন্ট স্প্রে করলেই বোধ হয় সব জীবাণু মরে যায়। টেক্সাস এ অ্যান্ড এম-এর ক্লিনিক্যাল প্রফেসর এবং হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ গবেষক ড. চেতন জিনাদাত্থার মতে, কোনো তলে ধুলাবালি বা জৈব ময়লা জমা থাকলে তা জীবাণুমুক্তকারক পদার্থের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় বা নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। তাই প্রথমে সাবান-পানি বা কোনো মাল্টিপারপাস ক্লিনার এবং মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে ঘর মুছে নিতে হবে। মাইক্রোফাইবার কাপড় ময়লা ও ধুলা চমৎকারভাবে আটকে ফেলে।
দরজার হাতল, লাইটের সুইচ, ড্রয়ারের নব, সিঁড়ির রেলিং এবং রিমোট কন্ট্রোলের মতো বহু ব্যবহৃত জিনিসগুলো প্রথম পরিষ্কার করুন। অসুস্থ ব্যক্তির ব্যবহৃত থালাবাসন গরম পানিতে সাবান গুলিয়ে বা ডিসওয়াশারে ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে। এ ছাড়া বাথরুমের কল, ট্যাপ, টয়লেট ফ্লাশ, বেসিন এবং মেঝেও সাবানপানি দিয়ে পরিষ্কার করে ডিসইনফেক্টেন্ট করতে হবে। এ ছাড়া চাইলে ব্লিচিং দ্রবণ ব্যবহার করেও সেটি করা যায়। এ সময় ব্যবহৃত টুথব্রাশটি পরিবর্তন করে ফেলাও বুদ্ধিমানের কাজ।
অনেক রোগের ভাইরাসই জামাকাপড় ও তোয়ালের মতো নরম পৃষ্ঠে বেঁচে থাকে। রোগমুক্তির পর পরনের কাপড়, বিছানার চাদর ও তোয়ালে গরম পানি এবং ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। আমেরিকার সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, অসুস্থ ব্যক্তির ব্যবহৃত পোশাক সাধারণ কাপড়ের সঙ্গেই ধোয়া যায়। তবে পানি যথেষ্ট গরম হওয়া এবং পোশাক পুরোপুরি শুকানো নিশ্চিত করতে হবে।
স্মার্টফোন, কি-বোর্ড বা ট্যাবলেটের মতো গ্যাজেটগুলোতে প্রচুর জীবাণু থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬৮ শতাংশ মোবাইল ফোন নানা ক্ষতিকর অণুজীব বহন করে। ফোন বা রিমোট পরিষ্কার করতে সাবান-পানিতে সামান্য ভিজিয়ে নেওয়া সুতি বা সুতিমুক্ত সুনির্দিষ্ট কাপড় কিংবা অ্যালকোহল-মুক্ত ড্রাই ওয়াইপস ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি, ঘরের দরজা-জানালা খুলে ভেতরের আবহাওয়া সতেজ করতে হবে যেন আবদ্ধ বাতাস বের হয়ে যেতে পারে।
আমরা সাধারণত কোনো কিছু স্প্রে করেই সঙ্গে সঙ্গে তা অন্য সুতি বা শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেলি। তবে যেকোনো জীবাণুমুক্তকারক পদার্থের পূর্ণ কার্যকারিতার জন্য নির্দিষ্ট সময় ভেজা অবস্থায় থাকতে দেওয়া প্রয়োজন। স্প্রে করার পর পণ্যের গায়ে নির্দেশিত সময় (সাধারণত ৩ থেকে ৫ মিনিট) অপেক্ষা করে তবেই শুকানো উচিত। তা না হলে জীবাণু পুরোপুরি ধ্বংস হয় না।
রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ির সুস্থ সদস্যদের সাহায্য নিয়ে অথবা সামান্য সুস্থতাবোধ করলে তবেই এই গভীর পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামা উচিত। সঠিক নিয়মে ঘর পরিষ্কারই পারে আপনার বাড়ি আবার আগের মতো নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে।
সূত্র: হেলথ লাইন, দ্য গার্ডিয়ান