রাতে ঘুমানোর আগে মুখে একাধিক লেয়ারের স্কিন কেয়ার সেরাম, ফেস মাস্ক, চোয়ালের চিনস্ট্র্যাপ, এমনকি সিল্কের বনেটের পাশাপাশি মুখ বন্ধ রাখতে কসমেটিক টেপ লাগিয়ে রাখা। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এসব একে একে খুলে ফেলার প্রক্রিয়াই হলো টিকটকের ভাইরাল ট্রেন্ড মর্নিং শেড। বিজ্ঞানসম্মত নিয়ম হলো, সহজ-সরল স্কিন কেয়ার রুটিন মেনে চলা। শুধু ফেসওয়াশ, ময়শ্চারাইজার ও রাতের নির্দিষ্ট ট্রিটমেন্টই যথেষ্ট। বাহ্যিক এই ঝক্কি এড়িয়ে পর্যাপ্ত প্রশান্তির ঘুমই সুস্থ ত্বক ও স্বাস্থ্যের মূল চাবিকাঠি।
ভিজুয়ালি চমকপ্রদ ও উদ্ভট হওয়ায় এই ভিডিওগুলো রাতারাতি সোশ্যাল মিডিয়ায় কোটি কোটি ভিউ পেতে শুরু করে। তবে নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্য ঘুমানোর আগের এই চরম ও আয়াসসাধ্য প্রস্তুতি দেখতে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, আধুনিক ত্বকের বিজ্ঞান এবং ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। ২০২৪ সালে টিকটকে এই বিউটি রুটিন হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অদ্ভুত সব নাইট-টাইম সাজসজ্জা এবং সকালের রূপান্তরের ভিডিও লাখ লাখ ভিউ পেতে থাকে। এই ট্রেন্ডের মূলকথাই ছিল, রাতে ঘুমানোর সময় নিজেকে যতটা উদ্ভট বা বিশ্রী দেখাবে, সকালে উঠে ততটাই সুন্দর ও উজ্জ্বল ত্বক পাওয়া যাবে। সুন্দর ও সতেজ ত্বক পাওয়ার পাশাপাশি অনেকে দাবি করেছিলেন, চোখের আই মাস্ক বা মাউথগার্ড ঘুমের মানও ভালো করে। নিখুঁত চেহারার সামাজিক চাপ এবং টিকটকের অ্যালগরিদমে অদ্ভুত ভিডিও দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার প্রবণতাই এই ট্রেন্ডকে ট্রেন্ডিংয়ের শীর্ষে পৌঁছে দেয়।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপচর্চার নামে রাতে অতিরিক্ত পণ্যের ব্যবহার ত্বকে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে। ত্বকে অতিরিক্ত ঘন বা ভারী সেরাম ও ক্রিম মেখে ঘুমালে রোমকূপ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মুখে ব্রণ উঠতে পারে। চোখের চারপাশের সংবেদনশীল ত্বকে মিলিয়া দেখা দিতে পারে। যেসব অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট বা অ্যাসিড অল্প সময়ের জন্য ব্যবহারযোগ্য, সেগুলো সারা রাত মুখে রেখে দিলে ত্বকে জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা ও কালচে দাগ হতে পারে। কাইনেসিওলজি টেপ দিয়ে চামড়া টেনে কুঁচকানো বন্ধের চেষ্টা করলে উল্টো ত্বক ইরিটেটেড হয়। ডার্মাটোলজিস্টরা জানান, বলিরেখা পড়া শুধু ত্বকের ওপরের নড়াচড়ার জন্য নয়, বরং এটি কোলাজেন কমে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সারা রাত প্লাস্টিকের মতো জেল মাস্ক মেখে রাখলেও শরীরের কোলাজেন পুনরুজ্জীবিত হয় না।
বিউটি ট্রেন্ড হলেও এটি ঘুমের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত করতে পারে। নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাসের জন্য অনেকে মুখে মাউথ টেপ ব্যবহার করেন। চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, টেপ দিয়ে মুখ বন্ধ করে ঘুমালে স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা তৈরি হতে পারে এবং শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। মুখে অসংখ্য প্যাচ, টেপ ও স্ট্র্যাপ নিয়ে স্বাভাবিকভাবে ঘুমানো কষ্টকর। রাতে এসবের অস্বস্তি ঘুমের স্বাভাবিক পর্যায় বিঘ্নিত করে শরীরের স্ট্রেস রেসপন্স বাড়িয়ে দেয়। ফলে ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যায়। যদি কেউ এই মর্নিং শেড রুটিন মেনে চলতে চান, তাহলে বিশেষজ্ঞদের মত, কিছু সতর্কতা ও সঠিক নিয়ম মেনে চলা জরুরি। ঘুম বিশেষজ্ঞ জেফ কানের মতে, রাতে ঘুমানোর সময় হঠাৎ মুখে নানা রকম মাস্ক, স্ট্র্যাপ বা টেপ পরলে তা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই এসব জিনিস সারা রাত ব্যবহারের আগে দিনের বেলা জেগে থাকা অবস্থায় অথবা দিনের ছোট একটু পাওয়ার ন্যাপ নেওয়ার সময় পরীক্ষামূলকভাবে করে দেখা উচিত। এতে শরীর ও ত্বক এই অনুভূতিগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সময় পায়।
কনসালট্যান্ট ডার্মাটোলজিস্ট সোফি মোমেনের মতে, সবার ত্বকের ধরন এক নয়, তাই রুটিনও এক হওয়া উচিত নয়। যাদের ত্বক তৈলাক্ত বা ত্বকে সহজে মেছতা বা ব্ল্যাকহেডস হয়, তাদের ভারী বা ঘন ক্রিমের প্রলেপ এড়িয়ে চলা উচিত। নইলে রোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণ উঠতে পারে। শুষ্ক ত্বকের জন্য সারা রাত হাইড্রেশন বা আর্দ্রতা বজায় রাখা প্রয়োজন। এর জন্য হায়ালুরনিক অ্যাসিড, পেপটাইড এবং সেরামাইডযুক্ত হালকা প্রোডাক্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
যেসব কেমিক্যাল বা অ্যাসিড সারা রাত রেখে দেওয়ার জন্য তৈরি নয়, সেগুলো কোনোভাবেই মুখে বেশিক্ষণ রাখা যাবে না; বিশেষ করে রেটিনল বা অন্যান্য স্ট্রং অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট একাধিক লেয়ারে মেখে রাখলে ত্বক অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে যেতে পারে এবং লালচে ভাব বা প্রদাহ তৈরি করতে পারে। সবকিছুর পর মনে রাখা দরকার, প্রকৃত সৌন্দর্যের মূল উৎস হলো একটানা ও শান্তির ঘুম। জেফ কান মনে করিয়ে দেন, কৃত্রিম উপকরণের চেয়ে শরীর প্রাকৃতিকভাবে সেরে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত গভীর ঘুম সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
সূত্র: হেলথ লাইন, দ্য গার্ডিয়ান