খারাপ একটা দিন কাটালেন। এরপর ঘরে ফিরে শান্তির জন্য আপনি কী করবেন? কিংবা প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকলে একটু প্রশান্তির খোঁজে আপনি কী করেন? কেউ বই পড়েন, কেউ ফোনের স্ক্রিন কিংবা টেলিভিশনে মনোযোগ দেন। কেউ আবার গান শোনেন কিংবা রান্না করেন। আবার অনেকে ঘরের পোষা প্রাণীটির দিকে হাত বাড়ান। পোষা কুকুরের গায়ে হাত বুলিয়ে দেওয়া কিংবা বিড়ালকে কোলে চেপে একটু আদর করা যেন মুহূর্তেই মন ভালো করে দিতে পারে। কিন্তু সত্যি কি পোষা প্রাণী আমাদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে? গবেষণা বলছে, প্রচণ্ড মানসিক চাপের মুহূর্তে বিড়ালকে আদর করা বা তাদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করা আপনার মেজাজ ভালো করার বদলে উল্টো আরও বিগড়ে দিতে পারে।
মনোবিজ্ঞানবিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ডাচ ও বেলজিয়ামের গবেষকেরা পোষা প্রাণীর সঙ্গে মানুষের এই মানসিক সম্পর্কের সমীকরণ খতিয়ে দেখেছেন। ওপেন ইউনিভার্সিটি অব দ্য নেদারল্যান্ডসের গবেষক ড. মাইকেল জানসেন্স ও ড. সান পেটার্সের নেতৃত্বে ১৮৮টি বিড়াল এবং তার চেয়ে কমসংখ্যক কুকুর পালকের মধ্যে পাঁচ দিনব্যাপী একটি সমীক্ষা চালানো হয়। একটি বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে দিনে প্রায় ১০ বার অংশগ্রহণকারীদের বর্তমান মনের ভাব, স্ট্রেস বা মানসিক চাপের মাত্রা এবং তাঁরা পোষা প্রাণীর সঙ্গে কোন ধরনের সময় কাটাচ্ছেন, তা ট্র্যাক করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে কুকুর বা বিড়ালের সঙ্গে সময় কাটালে মানুষের মন ভালো হয়, এটি সত্য। কিন্তু যখন একজন মানুষ প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকেন, তখন পোষা প্রাণীর উপস্থিতি সেই চাপ কমানোর ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। অবাক করা বিষয় হলো, কুকুরদের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন না হলেও বিড়ালের ক্ষেত্রে দেখা গেছে একদম বিপরীত চিত্র। তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে বিড়ালের সঙ্গে যত বেশি মেলামেশা বা আদর করার চেষ্টা করা হয়েছে, মালিকের নেতিবাচক অনুভূতি ও বিরক্তি ততটাই বেড়েছে।
গবেষকদের মতে, কুকুর ও বিড়ালের আচরণগত পার্থক্য এবং বিবর্তনের ইতিহাসই এর মূল কারণ।
বিড়ালের সঙ্গে কাটানো সময় সাধারণত কিছুটা শান্ত হয়। মানুষ যখন মানসিক চাপে থাকে, তখন বিড়ালের এমন নিষ্ক্রিয় আচরণ মালিককে নিজের সমস্যার কথা বারবার মনে করিয়ে দিতে পারে।
হাঙ্গেরির এওটভোস লোরান্ড ইউনিভার্সিটির আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুর মানুষকে সাহায্য করতে বা সান্ত্বনা দিতে যতটা উদ্গ্রীব থাকে, বিড়ালেরা ততটাই উদাসীন। বিড়াল মূলত স্বভাবগতভাবে স্বাবলম্বী এবং মানুষ তাদের পুরোপুরি পোষ মানাতে পারেনি।
অধিকাংশ মানুষ বিড়ালের শারীরিক ভাষা বা তাদের অপছন্দ বুঝতে ভুল করেন। নিজের খারাপ লাগার মুহূর্তে জোর করে বিড়ালকে আদর করতে গেলে বিড়াল বিরক্ত হয়ে সরে যেতে চায়, ফোঁস করে ওঠে বা থাবা মারে। এটি মালিকের মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
গবেষকেরা স্বীকার করেছেন, এই গবেষণায় বিড়াল পালকের সংখ্যা কুকুর পালকের চেয়ে কম ছিল। পাশাপাশি নেতিবাচক অনুভূতি বাড়ার হারটিও ছিল তুলনামূলক ছোট। পোষা প্রাণী হয়তো মুহূর্তের মধ্যে আপনার মানসিক চাপ বা অফিসের কঠিন সমস্যা সমাধান করে দিতে পারবে না। তবে তারা আপনাকে একাকিত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারবে কিছুটা। তাই কঠিন কোনো দিনে বিড়াল যদি আপনার কোলে এসে না বসে বা দূরে সরে থাকে, তবে তাকে জোর না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। দিন শেষে পোষা প্রাণীদের এই স্বাধীন অভিব্যক্তিই তাদের এত বিশেষ করে তোলে।
সূত্র: দ্য কনভারসেশন, দ্য ডেইলি মেইল