হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

গ্লোয়িং স্কিন আইভি ড্রিপ: উজ্জ্বল ত্বকের সহজ উপায় নাকি স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

ফিচার ডেস্ক

ছবি: পেক্সেলস

ত্বক মুহূর্তে উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও দাগহীন করতে রূপচর্চার জগতে এখন নতুন ক্রেজ গ্লোয়িং স্কিন আইভি ড্রিপ। কসমেটিক ক্লিনিক ও বিউটি পারলারগুলোতে বড় বড় বিজ্ঞাপন দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, কোনো প্রকার নাইট ক্রিম, সিরাম বা ফেশিয়াল না করে, স্রেফ স্যালাইনের মতো একটি ইনফিউশনের মাধ্যমে ধমনিতে নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পৌঁছে দিলেই ত্বক হয়ে উঠবে ভেতর থেকে উজ্জ্বল ও কাচের মতো স্বচ্ছ। কিন্তু ক্ষণস্থায়ী এই বিউটি ট্রেন্ডের পেছনে কী কী মারাত্মক স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি লুকিয়ে রয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো দিচ্ছে কড়া সতর্কবার্তা।

গ্লোয়িং স্কিন আইভি ড্রিপ আসলে কী?

সহজ ভাষায়, এটি একধরনের স্যালাইন ট্রিটমেন্ট, যার মাধ্যমে শিরায় ড্রিপ দিয়ে সরাসরি শরীরে উচ্চমাত্রার পুষ্টি উপাদান প্রবেশ করানো হয়। এতে মূলত তিনটি প্রধান উপাদান থাকে।

গ্লুটাথিয়ন: এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা মেলানিন বা ত্বকের কালচে রঞ্জক তৈরি প্রতিহত করতে মূল ভূমিকা রাখে।

ভিটামিন সি: কোলাজেন উৎপাদন বাড়াতে এবং ত্বকের হাইপারপিগমেন্টেশন বা দাগছোপ দূর করতে ব্যবহৃত হয়।

ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স ও খনিজ উপাদান: শরীরের সার্বিক ক্লান্তি দূর করতে ও ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে স্যালাইনের সঙ্গে যোগ করা হয়।

হজমপ্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে সরাসরি রক্তে মিশে যায় বলে এটি মুখে খাওয়া ভিটামিন ক্যাপসুলের চেয়ে বহুগুণ দ্রুত ফল দেয় বলে দাবি করেন কিছু চিকিৎসক।

ত্বকের উজ্জ্বলতায় এর স্থায়িত্ব কতটুকু?

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইভি ড্রিপের মাধ্যমে ত্বকে যে উজ্জ্বলতা আসে, তা স্থায়ী নয়। আমাদের শরীর প্রাকৃতিকভাবে মেটাবলিজম ও প্রস্রাবের মাধ্যমে বাড়তি উপাদান ছেঁকে বের করে দেয়। তা ছাড়া রক্তে গ্লুটাথিয়নের মাত্রা কমে গেলে কোষগুলোতে মেলানিন আবার স্বাভাবিক নিয়মেই তৈরি হতে শুরু করে। ফলে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা খরচ করে আইভি ড্রিপ নেওয়া বন্ধ করলে ত্বক আবার আগের রঙে ফিরে যায়। এতে একদিকে যেমন পকেটের ওপর চাপ বাড়ে, অন্য দিকে বারবার ড্রিপ নেওয়ার ফলে তা শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

ছবি: পেক্সেলস

স্বাস্থ্যগত ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি

ত্বক ফরসা বা উজ্জ্বল করার জন্য আইভি ড্রিপ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্লুটাথিয়ন ও অতিরিক্ত ভিটামিন শরীরে প্রবেশ করানোর কোনো অনুমোদিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। না জেনে বা অনভিজ্ঞ বিউটিশিয়ানের কাছে এই থেরাপি নিলে কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে শরীর। এসব শারীরিক ক্ষতির মধ্যে আছে—

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি: মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ইনফিউশন করার ফলে লিভার ও কিডনির ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। দীর্ঘ মেয়াদে অতিরিক্ত গ্লুটাথিয়ন গ্রহণের কারণে কিডনি বিকল হওয়া থেকে শুরু করে থাইরয়েড ও লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হতে পারে।

মারাত্মক অ্যালার্জি ও চামড়া খসে পড়া: ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্লুটাথিয়ন রক্তে গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন, তীব্র শ্বাসকষ্ট, এনাফাইল্যাক্সিস বা চামড়া খসে পড়ার মতো জীবনঘাতী স্টিভেন্স-জনসন সিনড্রোম দেখা দিতে পারে।

রক্তে সংক্রমণ: বিউটি পারলার বা নন-মেডিকেল ক্লিনিকে অদক্ষদের হাতে সুচ ফোটালে সংক্রমণ সরাসরি রক্তের সংবহনতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। এ প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিক জীবননাশের কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ

কোনো রেজিস্টার্ড চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের প্রেসক্রিপশন এবং শরীরে নির্দিষ্ট কোনো প্রোটিন বা পুষ্টির তীব্র ঘাটতি ছাড়া শুধু মেকআপ বা কসমেটিকসের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে রক্তের শিরায় স্যালাইন বা ড্রিপ নেওয়া একেবারেই উচিত নয়।

দ্রুত অলৌকিক ফলাফলের আশা বা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডে ভেসে নিজের শরীর ঝুঁকির মুখে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কসমেটিকস আইভি ড্রিপের ক্ষণস্থায়ী উপকারের চেয়ে সুষম ও প্রোটিনযুক্ত খাবার খাওয়া, প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার এবং নিরাপদ নিয়মিত স্কিনকেয়ার রুটিন মেনে চলাই প্রাকৃতিক ও দীর্ঘস্থায়ী সুন্দর ত্বকের চাবিকাঠি।

সূত্র: হেলথলাইন