হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

অতীতের ছায়ায় বর্তমানের স্বস্তি, কেন রেট্রো ফিল্টারে ভেসে যাচ্ছে আপনার নিউজফিড

ফিচার ডেস্ক

এই নস্টালজিয়া বা অতীতের প্রতি ব্যাকুলতা স্রেফ একটি হালকা আবেগ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর মানসিক প্রক্রিয়া। ছবি: পেক্সেলস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইন স্ক্রল করতেই কয়েক দিন ধরে চোখে পড়ছে বন্ধু কিংবা পরিচিত কারও পুরোনো ছবি। এগুলো আশি বা নব্বই দশকের ঝাপসা ছবি। ওয়ার্ম টোন আর রেট্রো ফিল্টারে তৈরি। কারও কারও হয়তো ওই সময়ে জন্মও হয়নি। তবু সে সময়ের ছবি এল কোথা থেকে! পুরোনো দিনের সেই ‘ভিন্টেজ ভাইব’ ফিরিয়ে আনার এই নতুন উন্মাদনায় মেতেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। জেন-জি থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষই আধুনিক প্রযুক্তির ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিকে ফিল্টার দিয়ে বদলে নিচ্ছেন অতীতের আমেজে। শুধু তা-ই নয়, নব্বইয়ের দশকে আপনি কেমন ছিলেন বা যদি ওই সময়ে তারুণ্যের দিনগুলো কাটাতেন তাহলে কেমন দেখাত তা দেখতেই সাম্প্রতিক এই ভাইরাল ট্রেন্ডে মেতে উঠেছেন বড় বড় তারকারাও।

কিন্তু কেন হুট করে বর্তমান সময়ের মানুষ অতীতে ডুব দিতে চাইছে? কেন এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল এই নস্টালজিক ট্রেন্ড? মনোবিজ্ঞান বলছে, এই নস্টালজিয়া বা অতীতের প্রতি ব্যাকুলতা স্রেফ একটি হালকা আবেগ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর মানসিক প্রক্রিয়া। কী সেটা?

অতীতের ছায়ায় কেন এই আশ্রয়?

একক পরিবার, শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, ভার্চুয়াল জগতের নানা পরিবর্তন মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে ফেলেছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান সময়ের চাপ ও একাকিত্ব দূর করতেই মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতীতে আশ্রয় খোঁজে। সুইজারল্যান্ডের চিকিৎসক জোহানেস হোফার ১৬৮৮ সালে প্রথম ‘নস্টালজিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি একে শুধু একধরনের শারীরিক বা মানসিক অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞান সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে মনোবিজ্ঞানীরা নস্টালজিয়াকে একটি ইতিবাচক ও সুরক্ষামূলক মানসিক শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তবে নিজেকে পুরোনো দিনের আদলে দেখার অভিপ্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এটাই প্রথম নয়। ২০১৬ সালে এসেছিল প্রথম থ্রোব্যাক ট্রেন্ড। আর এখন আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও হলিউডের প্রিয় তারকারা ছবিতে নিজেদের নিয়ে যাচ্ছেন আরও অনেকটা দূরে। তারকারা সাম্প্রতিক ভিডিওর পর ৯০-এর দশকের সেরা সেরা সব মুহূর্তের কোলাজ তুলে ধরছেন তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে।

নস্টালজিয়ার নেপথ্যে বিজ্ঞান ও মানসিক উপাদান

আমরা যখন পুরোনো দিনের কোনো গান শুনি, কোনো পরিচিত সুগন্ধ পাই কিংবা রেট্রো ফিল্টারে ছবি দেখি, তখন তা আমাদের মস্তিষ্কে বিশেষ প্রভাব ফেলে। গবেষকেরা বলছেন, ‘নস্টালজিক মুহূর্তগুলো মস্তিষ্কের আবেগময় অংশকে সক্রিয় করে। এতে ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের মতো হরমোন নিঃসৃত হয়। এগুলো আমাদের মন ভালো রাখতে এবং সুরক্ষার অনুভূতি তৈরিতে সাহায্য করে।’

রেট্রো ছবি বা পুরোনো স্মৃতিগুলো আমাদের জন্য একধরনের ‘ট্রানজিশনাল অবজেক্ট’ বা আবেগের বাহক হিসেবে কাজ করে। ছবি:পেক্সেলস

এ ছাড়া মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, রেট্রো ছবি বা পুরোনো স্মৃতিগুলো আমাদের জন্য একধরনের ‘ট্রানজিশনাল অবজেক্ট’ বা আবেগের বাহক হিসেবে কাজ করে। এগুলো আমাদের ফেলে আসা নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত জীবনের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করে। মানুষ যখন একাকিত্ব বা নেতিবাচক মানসিকতায় ভোগে, তখন অবচেতনভাবেই নস্টালজিয়ার শরণাপন্ন হয়।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, মানুষ সাধারণত কৈশোর ও তারুণ্যের প্রথম অভিজ্ঞতাগুলো সবচেয়ে স্পষ্ট মনে রাখে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘রেমিনিসেন্স বাম্প’। এ কারণেই ৯০ দশক বা ২০০০ সালের শুরুর দিকের স্টাইল ও ফ্যাশন বারবার ট্রেন্ডে ফিরে আসে।

ফিল্টারের পেছনের মনস্তত্ত্ব

অ্যালগরিদমের তৈরি ‘ডুমস্ক্রলিং’ আর অবিরাম নোটিফিকেশনের যুগে বাস করেও আজকের তরুণেরা যেন এক অজানা অতীতের ছায়া খুঁজছে। আশির দশক পেরিয়ে আসা জেন-জি প্রজন্মের জন্মই হয়েছে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের কোলাহলে। কিন্তু তাঁরাও এখন মেতে উঠেছে ১৯৯০-এর দশকের প্রেমে। থ্রিফট শপ, সিডি ক্যাসেট, পোলারয়েড ক্যামেরা থেকে শুরু করে ঢোলা ডেনিম প্যান্ট—সবখানেই ফিরে আসছে নব্বইয়ের আবহ। আর সেখান থেকেই বোঝা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নস্টালজিক ফিল্টার ব্যবহার করা আসলে পুরোনো আত্মপরিচয়ের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হওয়ার একটি চেষ্টা। আমরা কেবল একটি স্থান বা সময়কে অনুভব করি না। বরং সেই সময়ে আমাদের নিজের যে সরল ও আনন্দময় রূপ ছিল সেটিকেও উপলব্ধি করি। ফিল্টার ব্যবহার করে ছবি শেয়ার করার মাধ্যমে আমরা অন্যদের সঙ্গে একটি গভীর সামাজিক বন্ধন তৈরি করতে চাই। সব মিলিয়ে, বর্তমানের যান্ত্রিকতা ও অনিশ্চয়তা থেকে রেহাই পেতে নস্টালজিক ফিল্টারের এই ব্যবহার মোটেও ক্ষতিকর নয়। এটি মূলত মানুষের নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ ও নিরাপদ রাখার একটি সহজ ঘরোয়া উপায়। জেন-জিদের ক্ষেত্রে নব্বইয়ের দশকের এই সময়টি, যেখানে তাদের ছেলেবেলা কেটেছে তা একটি আশ্রয়ও বটে। ছবিতে তারা এমন একসময়কে দেখছে, যেখানে জীবনের গতি একটু ধীর, নিখুঁত না হওয়াটাও সুন্দর। যেখানে সম্পর্ক ও স্মৃতিগুলো কেবল স্ক্রিনের পিক্সেল নয় বরং স্পর্শযোগ্য বাস্তব।

আপনিও ছবি পোস্ট করতে চান? তার আগে যা লক্ষ্য রাখবেন

এআই দিয়ে ভিন্টেজ ছবি বানানোর ট্রেন্ডটিতে বর্তমানে বেশির ভাগ মানুষই গা ভাসাচ্ছেন। তবে ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার আছে কিছু বিষয় মাথায় রাখা ভালো।

  • নির্দিষ্ট নির্দেশনা দিন। কারণ, ইংরেজিতে ‘মেক দিস লক এইট্টিজ’-এর মতো অস্পষ্ট প্রম্পট দিলে এআই সাধারণ ও সাধারণ মানের ছবি তৈরি করে। পোশাকের ধরন, হেয়ারস্টাইল, ব্যাকড্রপ ও লাইটিং নির্দিষ্ট করে দিলে আউটপুট একদম নিখুঁত হয়।
  • খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পরখ করুন। কারণ, এআই মাঝেমধ্যে আঙুল, গয়নার নিখুঁত ভাঁজ বা পেছনের টেক্সট বিকৃত করে ফেলে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার আগে ছবিটি ভালোভাবে রিচেক করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
  • গোপনীয়তা ও অনুমতি বজায় রাখুন। কোনো সংবেদনশীল দলিল বা প্রাতিষ্ঠানিক নথি দৃশ্যমান এমন ছবি আপলোড করা থেকে বিরত থাকুন। সেই সঙ্গে অন্যের অনুমতি ছাড়া তাঁর ছবি এআইতে ব্যবহার করা উচিত নয়।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সাইকোলজি টুডে