বিজ্ঞান ও মানব সভ্যতার ইতিহাস বলে, শিল্পবিপ্লবের আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের ঘুমের ধরন আজকের মতো আট ঘণ্টার একটানা বা ছাঁচে ফেলা ছিল না। তানজানিয়ার হাদজা, বলিভিয়ার সিমানে কিংবা নামিবিয়ার সান সম্প্রদায়ের মতো আধুনিক শিকারি-সংগ্রাহক মানুষদের জীবনযাত্রা বিভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকেরা। তাঁরা দেখেছেন, আধুনিক যুগের মানুষ যেখানে অনিদ্রা বা স্লিপ ডিসঅর্ডারে ভুগছে, সেখানে এই অনগ্রসর গোষ্ঠীগুলোতে ‘ঘুমের সমস্যা’ বলে কোনো বিষয় নেই। ফলে সেটি নিয়ে কথা বললে মানুষ ঠিক বুঝে ওঠে না। কিন্তু কীভাবে আধুনিক কৃত্রিম আয়োজন ছাড়াই তাঁরা নিশ্চিত করেন প্রশান্তির ঘুম? তাঁদের জীবনধারা থেকে নেওয়া কিছু অভ্যাস কাজে লাগিয়ে আপনিও আপনার ঘুমের মান উন্নত করতে পারেন।
আমাদের শরীরের নিজস্ব একটি বায়োলজিক্যাল ঘড়ি রয়েছে। একে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। আধুনিক যুগে কৃত্রিম আলো আর স্ক্রিনের ব্যবহারে এই রিদম নষ্ট হয়ে যায়। শিকারি-সংগ্রাহক মানুষেরা দিনের শুরুতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো গ্রহণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে প্রচুর প্রাকৃতিক আলো পেলে রাতের কৃত্রিম আলো বা ডিজিটাল স্ক্রিনের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমে যায়।
শুধু আলো আমাদের পূর্বপুরুষদের ঘুম নিয়ন্ত্রণ করত, এমন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রাকৃতিক তাপমাত্রা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং ভোরের দিকে আবার তাপমাত্রা বাড়ার এই স্বাভাবিক চক্রই শরীরকে ঘুমানোর সংকেত দেয়। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের মতো স্থির তাপমাত্রায় না থেকে রাতে ঘরের থার্মোস্ট্যাট কিছুটা কমিয়ে রাখা বা জানালা খোলা রেখে তাপমাত্রার এই প্রাকৃতিক পরিবর্তন অনুভব করা ঘুমের পক্ষে সহায়ক।
সন্ধ্যা নামার পর শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীগুলো জীবিকা বা কাজের মতো বাস্তবিক চিন্তা বন্ধ করে দিত। তারা আগুনের চারপাশে বসে গল্প করা বা একে অপরের খবরাখবর নেওয়ার মতো মানসিক স্বস্তিদায়ক সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিত। ঘুমোতে যাওয়ার আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, গল্প করা বা মানসিক সংযোগ তৈরি করা শরীরকে একটি নিরাপদ ও চিন্তামুক্ত পরিবেশের বার্তা দেয়। এই চর্চা আপনার মস্তিষ্কে একধরনের প্রশান্তি দেবে, যা ভালো ঘুমের জন্য জরুরি রসদ।
আজকাল অনেকে রাতে একটানা আট ঘণ্টা না ঘুমাতে পারলে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। এরপর সারা দিন এই নিয়ে মানসিক অশান্তিতে থাকেন—আহা, কাল রাতে একটানা ঘুম হয়নি। বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞানীদের মতে, রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙা বা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে ঘুমের সময়সীমা কমা-বাড়া খুবই স্বাভাবিক মানবিক প্রক্রিয়া। প্রতিদিন একই নিয়মে একই পরিমাণে ঘুমাতে হবে—এই অতিরিক্ত উদ্বেগই আধুনিক মানুষের ঘুমের বড় শত্রু।
রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে পুনরায় ঘুমানোর জন্য কিছু সহজ কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে।
স্বাভাবিক এই জীবনধারা এবং সহজ কৌশলগুলো প্রয়োগ করার পরও যদি অনিদ্রা বা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী বা নিয়মে পরিণত হয়, তবে জটিলতা এড়াতে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: বিবিসি, হেলথ লাইন