হোম > জীবনধারা > সাজসজ্জা

লাল লিপস্টিক: সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের ক্ষমতা, দ্রোহ ও সৌন্দর্যের ইতিহাস

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

লাল লিপস্টিক শুধু প্রসাধন নয়, এটি ব্যক্তিত্বের ঘোষণা, আত্মবিশ্বাসের বর্ম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। ছবি: পেক্সেলস

সৌন্দর্যচর্চার পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় বহু প্রসাধনী আসে, আবার চলেও যায়। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো, প্রসাধনীর জগতে কোনটি হাজার বছর ধরে রাজত্ব করে চলেছে? আপনি কী ভাবছেন জানি না, তবে একটা উত্তর হতেই পারে—লাল লিপস্টিক। এটি শুধু একচিলতে প্রসাধন নয়, লাল লিপস্টিক আসলে ব্যক্তিত্বের ঘোষণা, আত্মবিশ্বাসের বর্ম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।

প্রাচীন আভিজাত্যের প্রতীক

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর মধ্যভাগ পাওয়া ক্লিওপেট্রার ভাস্কর্য। জানা যায়, মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা কচিনিল নামের এক বিশেষ পোকা ও লাল পিগমেন্ট গুঁড়া করে মোমের সঙ্গে মিশিয়ে লাল লিপস্টিক তৈরি করতেন। ছবি: উইকিপিডিয়া

লাল লিপস্টিকের ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। খ্রিষ্টপূর্ব ৩ হাজার ৫০০ অব্দে মেসোপটেমিয়ার রানি পুয়াবি (শুভাদ) সাদা সিসা ও লাল পাথর গুঁড়া করে ঠোঁট রাঙাতেন। এটি ছিল রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক। প্রাচীন সুমেরীয় অভিজাত পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুর পর তাঁদের এই রূপচর্চার উপাদান শামুক বা ঝিনুকের খোলসে ভরে সঙ্গে নিয়ে সমাহিত হতেন। অন্যদিকে মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা কচিনিল নামের এক বিশেষ পোকা ও লাল পিগমেন্ট গুঁড়া করে মোমের সঙ্গে মিশিয়ে তাঁর ঐতিহাসিক লাল লিপস্টিক তৈরি করতেন। তাঁদের কাছে এই রূপচর্চা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, এটি ছিল আধ্যাত্মিক সুরক্ষা ও দেব-দেবীর আশীর্বাদ লাভের মাধ্যম।

তবে ইতিহাস সব সময় লাল রঙের প্রতি সদয় ছিল না। প্রাচীন গ্রিসে লাল লিপস্টিক শুধু যৌনকর্মীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। সামাজিক নিয়ম অমান্য করে কোনো সাধারণ নারী তা ব্যবহার করলে আইনগত শাস্তির বিধান ছিল। রোমান সাম্রাজ্যে অবশ্য আবার লাল ঠোঁট উচ্চ মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে। যদিও পারদের মতো বিষাক্ত উপাদানের কারণে তখন অনেক অভিজাত নারী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তেন।

মধ্যযুগ, ডাইনি সন্দেহ ও রাজকীয় পুনরুত্থান

ইউরোপের মধ্যযুগে চার্চের প্রভাবে মেকআপ ও লাল লিপস্টিক ব্যবহারের হার বেশ কমে যায়। একে সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত স্বাভাবিক রূপের বিরোধী এবং অনৈতিক কাজ বলে মনে করা হতো। তবে ষোলো শতকে ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ এই ধারায় পরিবর্তন আনেন। অতি ফ্যাকাশে ত্বকের সঙ্গে তাঁর রক্তিম লাল ঠোঁট রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠে। রানি এলিজাবেথের মৃত্যুর পর লাল লিপস্টিক নিয়ে আবারও সামাজিক ভীতি তৈরি হয়। রাজা প্রথম জেমসের আমলে মেকআপকে ডাইনি বিদ্যার অংশ বলে মনে করা হতো। এমনকি ১৭৭০ সালে ব্রিটিশ আইনসভায় এমনও বিধান করা হয়েছিল, কোনো নারী যদি প্রসাধন বা লাল লিপস্টিক দিয়ে পুরুষকে প্রলুব্ধ করে বিয়ে করেন, তবে তাঁর বিচার করা হবে ডাইনি হিসেবে।

নারীর অধিকার ও দ্রোহের নতুন অস্ত্র

হিটলার লাল লিপস্টিক ভীষণ অপছন্দ করতেন বলে মিত্রশক্তির নারীদের কাছে এটি একধরনের লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। প্রতীকী ছবি পেক্সেলস

বিশ শতকের সূচনায় লাল লিপস্টিকের রূপক সম্পূর্ণ বদলে যায়। ১৯১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনের সময় বিউটি আইকন এলিজাবেথ আর্ডেন নারী আন্দোলনকারীদের হাতে লাল লিপস্টিক তুলে দেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্ত অবস্থান এবং সাহসিকতা বোঝাতে এলিজাবেথ কেডি স্ট্যান্টন ও এমিলাইন প্যানখার্স্টের মতো নারীরা প্রকাশ্য মিছিলে লাল ঠোঁটে অংশ নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই লাল রং হয়ে ওঠে দেশপ্রেম ও প্রতিরোধের প্রতীক। হিটলার লাল লিপস্টিক ভীষণ অপছন্দ করতেন। তাই মিত্রশক্তির নারীদের কাছে এটি একধরনের লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। নারীদের মনোবল ও সাহস বাড়াতে ভিক্টরি রেড ও ফাইটিং রেডের মতো রং কারখানা থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনীতেও সরবরাহ করা হতো।

পপ কালচার ও সর্বজনীন অনুষঙ্গ

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হলিউডের রুপালি পর্দায় লাল লিপস্টিক গ্ল্যামারের চূড়ান্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। মেরিলিন মনরো, অড্রে হেপবার্ন থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে টেলর সুইফট বা রিহানা—সবার কাছেই লাল লিপস্টিক এক সিগনেচার স্টাইল। এ ছাড়া ফরাসি নারীদের ফ্যাশনে মিনিমালিস্টিক সাজের সঙ্গে একচিলতে লাল লিপস্টিক ফ্রেঞ্চ গার্ল অ্যাসথেটিকের মূল ভিত্তি। বিপ্লবের এই রক্তিম ধারা এখনো অব্যাহত। ২০১৮ সালে নিকারাগুয়ায় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে কিংবা ২০১৯ সালে চিলিতে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নারীরা লাল লিপস্টিক মেখে রাজপথে নেমেছিলেন।

মেসোপটেমিয়ার গুঁড়া পাথর থেকে শুরু করে বর্তমানের উন্নত মানের স্যাটিন ফর্মুলা—প্রক্রিয়া বদলেছে, যুগ বদলেছে কিন্তু লাল লিপস্টিকের ক্ষমতা কমেনি। প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীর হাতে ঠোঁটে লাল রং লাগিয়ে নেওয়া কোনো সাধারণ মেকআপ নয়, এটি হলো হাজার হাজার বছরের নারীর ইতিহাস, তাদের লড়াই ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এক চিরন্তন উৎসব। লাল লিপস্টিকের চিরন্তন আবেদনের মূল রহস্য হলো যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা। এটি সব সময় নারীত্ব, সাহস এবং দ্রোহের এক স্থির প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে আজও। যে পৃথিবী প্রায়ই নারীদের জন্য সৌন্দর্য ও নারীত্বের সংজ্ঞা ঠিক করে দিতে চায়, সেখানে ঠোঁটে গাঢ় লাল রং লাগানো নিজেই এক বড় প্রতিবাদ। এর মাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া যায়, ‘আমি আমার গল্প নিজেই লিখি।’

সূত্র: ভোগ অস্ট্রেলিয়া, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ফেমিসিটি