প্রতিবছর বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ একটি অচেনা কিন্তু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে প্রাণ হারান। তার নাম সেপসিস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও এটি এখনো বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এটি শুধু শারীরিক জটিলতা নয়, বরং এটি জীবাণু এবং মানবদেহের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার এক চরম সংঘাতের ফল।
১৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ব সেপসিস দিবস পালিত হয়। এ রোগ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য ২০১২ সাল থেকে গ্লোবাল সেপসিস অ্যালায়েন্স দিনটি পালন করে আসছে। এ বছরের সেপসিস দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য হলো, ‘সেপসিস মোকাবিলায় বিনিয়োগ করুন, জীবন বাঁচান।’
সেপসিস হলো রক্তে সংক্রামক জীবাণুর উপস্থিতির কারণে শরীরের তীব্র ও জীবনঘাতী প্রতিক্রিয়া। আমাদের শরীরে যখন কোনো সংক্রমণ হয়, তখন রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা তার বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিন্তু কোনো কারণে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তা নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপরই আক্রমণ শুরু করে। ফলে রক্তচাপ কমে যায়, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দেয়; যাকে বলা হয় মাল্টি-অরগান ফেইলিউর।
প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস প্রথম সেপসিস শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, যা দিয়ে তিনি জৈব পদার্থের পচন বা পচে যাওয়াকে বোঝাতেন। তবে উনিশ শতকে লুই পাস্তুর এবং রবার্ট কচ জার্ম থিওরি আবিষ্কার করলে বোঝা যায়, অণুজীবই সেপসিসের মূল চালিকাশক্তি।
সেপসিস কোনো নির্দিষ্ট একক রোগের নাম নয়, এটি সংক্রমণের একটি জটিল রূপ। স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস, এশেরিকিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া ইত্যাদি ব্যাকটেরিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, কোভিড-১৯ ইত্যাদি ভাইরাস, ফাঙ্গাস বা ছত্রাক এবং পরজীবী দিয়েও এটি হতে পারে।
শরীরের যেকোনো জায়গার ছোট বা বড় সংক্রমণ থেকে সেপসিস হতে পারে। নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ, কাটাকাটি বা ক্ষত, অপারেশন পরবর্তী সংক্রমণ কিংবা পেটের যেকোনো জটিল সংক্রমণের সঠিক সময়ে বা সঠিকভাবে চিকিৎসা না হলে জীবাণু রক্তে প্রবেশ করে ছড়িয়ে পড়ে সেপসিস তৈরি করতে পারে।
প্রতি ৫টি মৃত্যুর ১টির পেছনে সেপসিসের ভূমিকা থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি শনাক্ত না হলে এবং সেপটিক শক অবস্থা তৈরি হলে রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। সেপসিস থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষের মধ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অথবা মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারেন। সেপসিসের প্রায় ৪০ শতাংশ ঘটনা ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ঘটে। আবার প্রায় ৮০ শতাংশ সেপসিসের ঘটনা হাসপাতালের বাইরে থেকে শুরু হয়।
সেপসিস একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। কারও মধ্যে এর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। সেপসিসের ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘণ্টাই গুরুত্বপূর্ণ; যত দ্রুত এটি শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করা যায়, জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা তত বেশি।
সেপসিসের আশঙ্কাজনক দিকটি হলো অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক রোগীর জীবন বাঁচাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। কিন্তু নিয়ম না মেনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণুগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যখন কোনো সুপারবাগ বা প্রতিরোধী জীবাণু দিয়ে সেপসিস হয়, তখন প্রচলিত ফার্স্ট-লাইন বা সেকেন্ড-লাইন অ্যান্টিবায়োটিকগুলো কাজ করে না। ফলে রোগীর চিকিৎসা অসম্ভব হয়ে ওঠে এবং অকালে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তে হয়।
সেপসিস ব্যবস্থাপনায় ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ রোগে যে তিনটি পরীক্ষা অতি জরুরি—
ব্লাড কালচার: রক্তে কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক আছে, তা শনাক্ত করার মূল পরীক্ষা এটি।
অ্যান্টিবায়োটিক সেন্সিটিভিটি টেস্ট: কোন অ্যান্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট জীবাণুটিকে মারতে সক্ষম, তা ল্যাবেই নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা হয়।
বায়োমার্কার পরীক্ষা: রক্তে প্রোক্যালসিটোনিন বা পিসিটি এবং সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন বা সিআরপির মাত্রা দেখে সেপসিসের তীব্রতা বোঝা যায়।
সেপসিসের চিকিৎসায় সময় সবচেয়ে বড় নিয়ামক। উপসর্গ দেখা দেওয়ার প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ শুরু করতে হয়। এই সময় হলো গোল্ডেন আওয়ার। রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সেরামে শিরায় স্যালাইন দেওয়া হয়। প্রয়োজন ভেদে অক্সিজেন, ডায়ালাইসিস বা লাইফ সাপোর্ট (ভেন্টিলেটর) ব্যবহারের জন্য রোগীকে আইসিইউতে স্থানান্তর করতে হয়।
হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো সেপসিসও জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা। এর গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক লক্ষণ হলো—
পরিচ্ছন্নতা: সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখা।
ক্ষতের যত্ন: যেকোনো ছোটখাটো কাটাছেঁড়া বা ক্ষত স্থান সঠিকভাবে পরিষ্কার ও ব্যান্ডেজ করা।
টিকা নেওয়া: নিউমোনিয়া, ফ্লু বা অন্যান্য সংক্রামক রোগের টিকা নেওয়া।
অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া এবং কোর্স সম্পূর্ণ করা।
উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশেই সেপসিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণার অভাব রয়েছে। অধিকাংশ মানুষ জানেন না যে একটি সাধারণ ক্ষত বা মূত্রনালির সংক্রমণ থেকে মৃত্যু হতে পারে।
সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় নিয়মিত তথ্যবহুল লেখা প্রকাশ করা। তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সেপসিসের প্রাথমিক উপসর্গ চেনার প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
হাসপাতালগুলোতে সেপসিস রেসপন্স টিম এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ প্রটোকল কঠোরভাবে বজায় রাখা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংক্ষিপ্ত ইনফোগ্রাফিক ও বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।