রমজান মাস মানে ইফতারের টেবিলে ছোলার অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি। পেঁয়াজি, বেগুনি আর মুড়ির সঙ্গে মাখানো ঝাল-মসলাযুক্ত ছোলার স্বাদ ছাড়া বাঙালির ইফতার যেন অপূর্ণ থেকে যায়। তবে স্বাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই ছোলা বা চিকপিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে স্বীকৃত; বিশেষ করে তেলে ভাজা চপ-বেগুনি বাদ দিয়ে শুধু সেদ্ধ ছোলা বা অল্প মসলায় রান্না করা ছোলা শরীরের জন্য এক দারুণ ওয়েলনেস হিরো হিসেবে কাজ করে। উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের অন্যতম সেরা উৎস ছোলা আমাদের হার্ট থেকে শুরু করে হাড়ের সুরক্ষা—সব ক্ষেত্রে জাদুর মতো কাজ করে।
সারা দিন রোজা রাখার পর ইফতারে অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেলার প্রবণতা থাকে। সেদ্ধ ছোলা প্রোটিন ও ফাইবার বা আঁশের এক দারুণ সংমিশ্রণ। প্রতি ১০০ গ্রাম সেদ্ধ ছোলায় প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন এবং ৭ থেকে ৮ গ্রাম আঁশ থাকে। এই আঁশ হজমপ্রক্রিয়া ধীর করে দেয়। ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা অনুভূত হয় এবং আজেবাজে স্ন্যাকস খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায়। যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের জন্য এটি একটি আদর্শ লো-ক্যালরি খাবার। ছোলা একটি উচ্চমানের পুষ্টিকর খাদ্য উপাদান। এই রমজানে ইফতারের মেনুতে ভাজাভুজির বদলে সেদ্ধ ছোলার পরিমাণ বাড়িয়ে আপনার শরীরকে দিন বাড়তি সতেজতা ও শক্তি।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ছোলা একটি দারুণ খাবার। এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক কম। ফলে ফলে এটি খাওয়ার পর রক্তে হঠাৎ করে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায় না। এটি শরীরে শক্তি সরবরাহ করে এবং ইনসুলিনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ছোলার দ্রবণীয় আঁশ পরিপাকতন্ত্রে কোলেস্টেরলকে আটকে ফেলে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। এতে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। নিয়মিত সেদ্ধ ছোলা খেলে ধমনিতে চর্বি জমার ঝুঁকি কমে এবং হৃদ্যন্ত্র ভালো থাকে।
ছোলার অদ্রবণীয় আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজম প্রক্রিয়া সচল রাখে। এ ছাড়া এতে থাকা প্রিবায়োটিকস উপাদান অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং মেজাজ ফুরফুরে রাখতেও সাহায্য করে।
সুস্থ হাড়ের জন্য শুধু ক্যালসিয়াম যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে ম্যাগনেশিয়াম ও ফসফরাসের প্রয়োজন। ছোলায় এই তিনটি উপাদানই বিদ্যমান। ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম মিলে হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত করে এবং বয়সজনিত হাড়ের ক্ষয়রোধে সহায়তা করে।
ছোলার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের অকালবার্ধক্য রোধ করে এবং ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বজায় রাখে। এ ছাড়া এতে থাকা প্রোটিন, আয়রন ও জিংক চুলের গোড়া শক্ত করতে এবং দ্রুত চুল গজাতে সাহায্য করে। বেসন বা ছোলার গুঁড়ার ফেসপ্যাক ত্বকের বাড়তি তেল দূর করে রোদে পোড়া ভাব কাটাতেও বেশ কার্যকর।
যাঁরা সারা দিন ক্লান্তি অনুভব করেন, তাঁদের শরীরে আয়রনের অভাব থাকতে পারে। ছোলা আয়রনের এক চমৎকার উৎস। হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়িয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছোলার সঙ্গে সামান্য লেবুর রস (ভিটামিন সি) মিশিয়ে খেলে আয়রন শোষণ আরও ভালো হয়।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ছোলাকে শিম্বি ধান্য বর্গ বা লেবুজাতীয় শস্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি শরীরে বাত, পিত্ত ও কফের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে; বিশেষ করে ভেজানো ও সেদ্ধ ছোলা শরীরের শক্তি এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে অনন্য।
সূত্র: নেট মেডস, হেলথ লাইন
আরও পড়ুন-