যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে মার্কিন সরকারের ‘ভিসা বন্ড’ নীতি। নতুন এই ব্যবস্থায় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে ভিসা আবেদনের অংশ হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ জমা দিতে হবে। এই সিদ্ধান্তে পর্যটন, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিবাসন আইন মানা নিশ্চিত করতে এই ভিসা বন্ড চালু করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের বড় একটি অংশের মতে, এই নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠবে, যা অনেকের জন্য আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
কী এই ভিসা বন্ড, কেন চালু হলো
ভিসা বন্ড মূলত একটি ফেরতযোগ্য জামানত। যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের আগে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ জমা দিতে হবে, যা ভিসার শর্ত মেনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশ ছাড়লে ফেরত পাওয়া যাবে। তবে কেউ যদি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন বা শর্ত লঙ্ঘন করেন, তাহলে এই অর্থ বাজেয়াপ্ত হতে পারে।
মার্কিন সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিসা মেয়াদ অতিক্রম করে অবস্থান (ওভার-স্টে) ঠেকানো এবং অভিবাসন আইন মানতে বাধ্য করাই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য।
তবে অনেকে বলছেন, বাংলাদেশসহ যেসব দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া এমনিতেই দীর্ঘ, জটিল ও ব্যয়বহুল—এই নতুন বন্ড ব্যবস্থা তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করবে।
বাংলাদেশিদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা বন্ড একটি বড় অর্থনৈতিক বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভিসা ফি, বিমানের টিকিট, ভ্রমণ বিমা, থাকা-খাওয়ার খরচের সঙ্গে এই বন্ড যুক্ত হলে মোট ব্যয় অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং সাধারণ পর্যটকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। যাঁরা আগে যুক্তরাষ্ট্রকে পড়াশোনা, ব্যবসা বা ভ্রমণের সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে দেখতেন, তাঁদের অনেকে এখন নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন।
শিক্ষা, ব্যবসা ও পর্যটনে প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জনপ্রিয় গন্তব্য। পাশাপাশি ব্যবসায়িক সম্মেলন, প্রশিক্ষণ ও বৈঠকের জন্যও বহু বাংলাদেশি নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করেন।
নতুন ভিসা বন্ড নীতির ফলে এসব ক্ষেত্রে আবেদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা উচ্চ ব্যয়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে অন্য দেশ বেছে নিতে পারেন। ব্যবসায়ীরাও আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেওয়া থেকে পিছিয়ে যেতে পারেন।
এতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সাংস্কৃতিক ও পেশাগত বিনিময়েও ধাক্কা
এই নীতি শুধু ভ্রমণ নয়, দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও পেশাগত বিনিময়েও বাধা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশি উদ্যোক্তা, গবেষক ও পেশাজীবীরা যুক্তরাষ্ট্র সফরের মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগ গড়ে তোলেন, তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর ফলে যৌথ গবেষণা, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত দুই দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ভিসা বন্ড নীতির প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত ভ্রমণে সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশিদের মাধ্যমে দেশে যে রেমিট্যান্স আসে, সেটিও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগও সংকুচিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন বাজার খোঁজার ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় অনেক উদ্যোক্তার পরিকল্পনা থামিয়ে দিতে পারে।
অন্য দেশেও কি চালু হবে এই নীতি
বর্তমানে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ এই ভিসা বন্ড নীতির আওতায় এলেও ভবিষ্যতে আরও দেশ এতে যুক্ত হতে পারে। যেসব দেশের নাগরিকদের ভিসা মেয়াদ অতিক্রমের হার বেশি, তাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিসা বন্ড বাংলাদেশিদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়ম মেনে ভ্রমণ শেষে টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকলেও শুরুতে বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করা অনেকের পক্ষে কঠিন। ফলে শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা ভ্রমণ—সব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দরজা বাংলাদেশিদের জন্য আরও সংকীর্ণ হয়ে আসছে। এই নীতি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও দুই দেশের সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তথ্যসূত্র: ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর ওয়ার্ল্ড