সোশ্যাল মিডিয়া এখন তরুণদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ। নতুন এক গবেষণা বলছে, মাত্র এক সপ্তাহ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কমালে বা বিরতি নিলে মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। মেডিকেল সাময়িকী ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গবেষণায় অংশগ্রহণের কারণে এক সপ্তাহ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার না করায় তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং ঘুমের সমস্যার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া তরুণদের মধ্যে উদ্বেগের লক্ষণ কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ, বিষণ্নতার উপসর্গ ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অনিদ্রার উপসর্গ কমেছে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। মোট ৩৭৩ জন তরুণ-তরুণী এই গবেষণায় অংশ নেন।
কোন কোন প্ল্যাটফর্মে সময় কমানো হয়েছিল
গবেষণায় বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয় পাঁচটি জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের দিকে। সেগুলো হলো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও এক্স। অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের সুবিধামতো স্ক্রিন টাইম কমান। দেখা যায়, সবাই কোনো না কোনোভাবে সব প্ল্যাটফর্মে সময় কমিয়েছিলেন। তবে ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাট পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া তুলনামূলক কঠিন ছিল। টিকটক ব্যবহার কমাতে অংশগ্রহণকারীরা বেশি আগ্রহী ছিলেন। ফেসবুক ও এক্স ছিল সবচেয়ে কম ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মের তালিকায়।
সোশ্যাল মিডিয়া, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার সম্পর্ক
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া একদিকে মানুষকে যুক্ত রাখলেও অন্যদিকে এটি মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। চিকিৎসকদের ভাষায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের সাজানো-গোছানো জীবন ও নিখুঁত শরীরের ছবি দেখে অনেকে নিজের সঙ্গে তুলনা করেন। এই তুলনাই আত্মসম্মান কমিয়ে দেয় এবং উদ্বেগ ও বিষণ্নতার জন্ম দেয়। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি করা, যাতে ব্যবহারকারী দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে আটকে থাকেন। ফলে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, কথা বলা বা সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায়। ধীরে ধীরে এতে সামাজিক যোগাযোগের মানসিক উপকারও কমে যেতে থাকে।
শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মোবাইল ফোনে ডুবে থাকলে হাঁটা, খেলাধুলা বা শরীরচর্চার সুযোগ কমে। ফলে শরীর থেকে ভালো লাগার হরমোন নিঃসরণও কম হয়। এর প্রভাব পড়ে মেজাজ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।
ঘুমের সমস্যা
গবেষকেরা জানিয়েছেন, স্ক্রিনে সময় কাটানোর কারণে ঘুমের বড় ক্ষতি হয়। একে বলা হয় ডিসপ্লেসমেন্ট হাইপোথিসিস। স্ক্রিনে কাটানো সময় সরাসরি ঘুম কমিয়ে দেয়। বারবার নোটিফিকেশনের শব্দ এবং ‘কিছু মিস হয়ে যাবে’—এই ভয় মানুষের মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখে, বিশেষ করে রাতে। এমনকি মোবাইল ফোন ব্যবহার না করলেও শোয়ার ঘরে সেটি থাকায় ঘুমের মান খারাপ হতে পারে, এমন তথ্যও উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়। রাতে বিছানায় শুয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ে, ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। পাশাপাশি মোবাইল ফোন স্ক্রিনের নীল আলো ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটায়।
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কমাবেন কীভাবে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন তরুণদের পুরোপুরি স্ক্রিন থেকে দূরে রাখা কঠিন। তাই হঠাৎ সব বন্ধ করার বদলে ধীরে ধীরে সময় কমানোই ভালো। পরিবারে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি। বাবা-মা চাইলে সন্তানের সঙ্গে বসে একটি ব্যবহারের পরিকল্পনা করতে পারেন এবং দুপক্ষই স্ক্রিন টাইম কিছুটা কমাতে চেষ্টা করতে পারেন। স্ক্রিনের সময় কমানোর পাশাপাশি বাস্তব জীবনের আনন্দদায়ক কাজ বাড়ানো দরকার। বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে আড্ডা, বোর্ড গেম খেলা, একসঙ্গে সময় কাটানো বা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ‘নো-স্ক্রিন সময়’ হিসেবে রাখা কাজে দিতে পারে।
তবে সব দিক বিবেচনায় গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। সেটি হলো, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সাময়িক বিরতি বা ব্যবহার কমানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। ব্যস্ত ও ডিজিটাল জীবনের মাঝেও যদি মানুষ নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে নেয়, তাহলে উদ্বেগ কমে, ঘুম ভালো হয় এবং মন আরও শান্ত থাকে।
নতুন বছরে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করতে শরীর ও মনের সুস্থতার কোনো বিকল্প নেই। এক সপ্তাহ ব্যবহার না করে এ সুস্থতার যাত্রা শুরু করতে পারেন। তারপর ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেললেন আপনার স্ক্রিন টাইম। এটি শুধু যে আপনাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনবে, তা-ই নয়। আপনার আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক অবস্থানও ভালো রাখবে।
সূত্র: মেডিকেল নিউজ টুডে