পৌষের শেষ প্রহরে শীতের নরম রোদ যখন গ্রামবাংলার উঠানে আলতো করে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই প্রকৃতি জানান দেয় মাঘের আগমনের। ধোঁয়া ওঠা চুলা, খেজুর গুড়ের মিষ্টি সুবাস আর মানুষের প্রাণখোলা হাসিতে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। এমনই এক আবহে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় আয়োজন করা হয় চাষিদের পিঠা উৎসব—যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় কৃষিজীবন, লোকজ সংস্কৃতি আর মানুষের আন্তরিক বন্ধন। ব্যতিক্রমী চাষিদের পিঠা উৎসব শুরু হয় গত বৃহস্পতিবার রাতে, শেষ আজ শুক্রবার দুপুরে। মাঘের শুরুর প্রান্তে শীতের কোমল রোদ আর গ্রামীণ পরিবেশে সাইংজুরী মাঠে কৃষক স্কুল সমবায় সমিতির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই পিঠা উৎসব গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তোলে। মাঘ মাসকে স্বাগত জানাতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কৃষিজীবন, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রকাশ ঘটে।
উৎসবের দিনে কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত ধানের (চাল), নারকেল, খেজুর গুড়সহ প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে ভাপা, চিতই, দুধ চিতই, পাটিসাপটা, দুধপুলি, মোরগ সম্ভার, খেজুরের কাঁচা রসের পায়েস ও নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করেন। শীতের আমেজে ধোঁয়া ওঠা চুলা, হাসি-আড্ডা আর পিঠার মিষ্টি ঘ্রাণে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর। উপজেলার বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের সাইংজুরী, রাশেশ্বরপট্টি, কাউটিয়া, আশাপুর, কুশুন্ডা, পেঁচরকান্দা, সাতবাড়িয়া ও বালিয়াখোড়া গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক কৃষক এই উৎসবে অংশ নেন। পাশাপাশি এসব গ্রামের এতিম শিশু, অসহায় বয়োবৃদ্ধ এবং উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন থেকে নির্বাচিত দুজন করে আদর্শ কৃষককে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সাইংজুরী কৃষক স্কুল সমবায় সমিতির সভাপতি মো. দুলাল মিয়া বলেন, ‘এই পিঠা উৎসব আমাদের কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করার একটি প্রয়াস। নিজেদের উৎপাদিত ফসল দিয়ে তৈরি খাবারের মধ্য দিয়ে আমরা গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ধরে রাখতে চাই এবং নতুন প্রজন্মকে কৃষি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে চাই।’ উৎসবে অংশ নেওয়া কিষানি ডালিয়া আক্তার বলেন, ‘নিজের ঘরে ফলানো চাল দিয়ে পিঠা বানিয়ে সবাইকে খাওয়াতে পারা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। এমন আয়োজন হলে নারীরাও পরিবার ও সমাজের সঙ্গে আরও বেশি করে যুক্ত হতে পারে।’ সমিতির সদস্য ও অন্যতম আয়োজক আল আমিন বলেন, ‘এটি শুধু পিঠা খাওয়ার আয়োজন নয়, এটি আমাদের মিলনমেলা।
এখানে এসে কৃষকেরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন, অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন, যা আমাদের কৃষিকাজে নতুন অনুপ্রেরণা জোগায়।’ উৎসবে যোগ দেওয়া প্রাকৃতিক কৃষি খামারের পরিচালক দেলোয়ার জাহান বলেন, ‘পৌষের শেষ আর মাঘের শুরুতে প্রকৃতিতে যে নবজাগরণ ঘটে, এই আয়োজন তারই প্রতিফলন। কৃষকদের এমন উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। প্রাকৃতিক কৃষি ও স্থানীয় খাদ্য সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক, যা টেকসই কৃষির পথকে আরও শক্তিশালী করে।’ এই পিঠা উৎসবে স্থানীয় কৃষক, কিষানি, বয়োজ্যেষ্ঠ, তরুণ, শিশুসহ প্রায় দুই শতাধিক মানুষ অংশ নেয়। পুরো আয়োজনটি রূপ নেয় এক আন্তরিক সামাজিক মিলনমেলায়। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত মেহমানদের নতুন গামছা দিয়ে বরণ করা হয়। এরপর শুরু হয় কৃষি ও কৃষক প্রতিপাদ্যে আলোচনা সভা ও মতবিনিময়। পিঠা পরিবেশন শেষে স্থানীয় কৃষক ও শিল্পীরা বাংলার ঐতিহ্যবাহী গান পরিবেশন করেন, যা উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আয়োজকেরা জানান, মাঘ মাসের এই চাষিদের পিঠা উৎসব প্রমাণ করে—মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির বন্ধন আজও অটুট, আর কৃষকের হাসিই গ্রামবাংলার প্রকৃত উৎসব। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনুষ্ঠান আরও বড় পরিসরে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।