হোম > জীবনধারা > ভ্রমণ

শীতের মৌসুমে উত্তরবঙ্গের পথে-প্রান্তরে

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম 

হিমালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় উত্তরবঙ্গে শীতের প্রকোপ বেশি থাকে। যাঁরা শীত উপভোগ করতে চান, তাঁরা ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত যেতে পারেন রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার যেকোনোটিতে। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।

কনকনে শীতের সন্ধ্যা। অধিকাংশ মানুষ যখন লেপের নিচে, তখন আমরা ঢাকার কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে। ঠিক রাত ১১টার বাসে উঠে পড়লাম। গন্তব্য হাড়কাঁপানো শীতের রাজ্য নীলফামারী।

গাবতলী পার হয়ে কুয়াশার চাদর ভেদ করে আমাদের বাস ছুটে চলেছে। প্রথম যাত্রাবিরতি বগুড়ায়— ২০ মিনিটের বিরতি। বাস থেকে নামতেই দেখি কুয়াশার কারণে দেখা যাচ্ছে না কিছুই। বিরতি শেষে গিয়ে বাসে বসলাম। সকালে সৈয়দপুর পৌঁছে চালক তাঁর চেহারা থেকে গরম কাপড় সরাতেই আমরা আবিষ্কার করলাম, চালক আর কেউ নন আমাদের এক ভ্রমণসঙ্গীর মহল্লার ভাঙারির দোকানি, পরিচিত। তাঁদের আলাপ এগোতেই আমরা নীলফামারীর বড়ভিটা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে নেমে পড়ি।

নাশতা সেরে অটোতে চড়ে সোজা চলে যাই নীলসাগর। নির্ধারিত ৩০ টাকা প্রবেশ ফি দিয়ে ভেতরে ঢুকে হাঁটতে থাকি। দিঘির পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। কিছু দূর যেতেই চোখ আটকায় দিঘির জলে। একপর্যায়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে হাঁটতে শুরু করি। ধীরে ধীরে ভালো লাগতে শুরু করল দিঘিটি।

নীলফামারীর নীলসাগর স্তম্ভ। এর পেছনে প্রায় ৩৩ একর আয়তনের দিঘি দেখা যাচ্ছে। ছবি: লেখক

সদর উপজেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ধোপাডাঙ্গা মৌজায় প্রায় ৫৪ একর জায়গাজুড়ে নীলসাগর পার্কের অবস্থান। এর মধ্যে মূল দিঘির আয়তন প্রায় ৩৩ একর। এর খননকাল অষ্টম শতকের কোনো একসময়ে বলে মনে করা হয়। পাশা খেলায় হেরে যাওয়া নির্বাসিত পাণ্ডবদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য বিরাট রাজা এই দিঘিটি খনন করে দিয়েছিলেন বলে গল্প চালু আছে এলাকায়। তখনকার সময়ে এর নাম ছিল বিন্নাদিঘি। এরপর ১৯৭৯ সালে সে সময়কার মহকুমা প্রশাসক বিন্নাদিঘিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এর নাম দেন নীলসাগর। বর্তমানে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। দিঘিতে সারা বছর কমবেশি অতিথি পাখির কলতান দর্শনার্থীদের বিমোহিত করে। একটু খেয়াল করলে নানা জীববৈচিত্র্যের দেখা মেলে। নজর কাড়ে দিঘির পানিতে ফুটে থাকা সারি সারি পদ্ম আর শাপলা।

নীলসাগর ছেড়ে এবার গন্তব্য কিশোরগঞ্জ। অটোতে যেতে যেতে ট্যাংগনমারীতে থামি। আগে থেকেই সেখানে ছিলেন দে'ছুটের রিসার্চ অর্গানাইজার কাইউম ভাই। তাঁর সঙ্গে বসে স্থানীয় এক হোটেলের মজাদার খাবার দিয়ে উদর পূর্তি হলো। এরপর মালাই চা খেয়ে চলে গেলাম ধাইজান গ্রামে। ছবির মতো সুন্দর সেই গ্রাম। সেখানে রাতে কবরস্থানের জমিতে তাঁবু খাঁটিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

ভেড়ভেড়ী গ্রামের প্রায় ৫০০ বছর পুরোনো চাঁদখোসাল জামে মসজিদের একাংশ। ছবি: লেখক

দিনের আলো পড়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত গ্রামটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম আমরা। ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা নামে। কিষান-কিষানিরা মাঠ ছেড়ে বাড়ি ফেরে। আমরাও ফিরে তাঁবু টানানো শুরু করি। গভীর রাত পর্যন্ত চলে বারবিকিউ। পরদিন সকালে চলে যাই ভেড়ভেড়ী। সেখানে রয়েছে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো চাঁদখোসাল জামে মসজিদ। মসজিদটি ঘিরে নানা মিথ চালু রয়েছে। মসজিদের ইমাম জানালেন, চাঁদখোসাল মসজিদটি এক রাতে নির্মাণ করেছিল জিনেরা! এর পক্ষে নানা যুক্তিও দাঁড় করালেন তিনি।

চাঁদখোসাল জামে মসজিদ বাইরে থেকে তেমন দৃষ্টিনন্দন না হলেও এর ভেতরের কারুকাজ বেশ নান্দনিক। মূল অবকাঠামোর তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট, দৈর্ঘ্য ৪০ ও প্রস্থ প্রায় ১০ ফুট। চুন, সুরকি ও পোড়ামাটি দিয়ে তৈরি ভিন্ন আঙ্গিকের দৃষ্টিনন্দন কারুকাজশোভিত চাঁদখোসাল মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণ করা জরুরি।

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের ভিন্ন জগৎ পার্ক। ছবি: লেখক

এর পরের গন্তব্য ভিন্ন জগৎ পার্ক। ভেড়বেড়ী থেকে ভিন্ন জগৎ প্রায় ২২ কিলোমিটার। তপ্ত রোদে বসে আছি ভ্যানে। এটাও একপ্রকার ভ্রমণকালীন মজাদার অভিজ্ঞতা। মাঝেমধ্যে সুন্দর কিছু দেখলে থেমে গিয়েছি। ভ্রমণ করতে গিয়ে ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের যাপিত জীবন সম্পর্কে ধারণা নেওয়াটাও একপ্রকার অভিজ্ঞতা। যেতে যেতে পার্কের সদর দরজায় হাজির। ভেতরে ঢুকে আন্দাজ করলাম এর বিশালতা। প্রথমেই নেমে যাই সুইমিংপুলে। এরপরে বিভিন্ন রাইড ঘুরে যাই ভূতের জগতে। সাধারণত আমরা বন-জঙ্গলে ঘোরা মানুষ। এ রকম কৃত্রিম পার্কে যাওয়ার তেমন অভ্যাস নেই। কিন্তু ভিন্ন জগতের বিশাল গণ্ডির মাঝে নানা ফুলের সমারোহ ও প্রকৃতিবান্ধব পার্কটি বেশ ভালো লাগার মতো। বলা যেতে পারে, নামের সঙ্গে অবিচার করা হয়নি।

যাবেন কীভাবে

ঢাকার গাবতলী থেকে বাস ও কমলাপুর থেকে ট্রেনে সরাসরি নীলফামারী যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে রংপুর কিংবা দিনাজপুর হয়েও যেতে পারেন। আবার ঢাকা টু সৈয়দপুর প্লেনে গিয়ে সেখান থেকে নীলফামারী যাওয়া খুব সহজ।

থাকা-খাওয়া

নীলফামারীতে প্রচুর হোটেল-মোটেল রয়েছে। চাইলে ভিন্ন জগতের রিসোর্টেও থাকা-খাওয়া যায়।

ভ্রমণ উপযোগী সময়

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়কারী মানুষদের জন্য বছরের প্রতিটি ঋতুতে অর্থাৎ বারো মাসই উত্তরবঙ্গের যেকোনো জেলা ঘোরার উপযুক্ত সময়। তবে শীতে উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে আলাদা অভিজ্ঞতা নেওয়া যায়। যাঁরা শীত উপভোগ করতে চান, তাঁরা ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত যেতে পারেন। হিমালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় পুরো রংপুর বিভাগ অর্থাৎ উত্তরবঙ্গে শীতের প্রকোপ বেশি থাকে।

ছবি: দে’ছুট ভ্রমণ সংঘ

২০২৬ সালে এশিয়ার সেরা দুই ‘ফুড ডেস্টিনেশন’

শীতে অতিথি পাখির সন্ধানে

নতুন বছরে বিশ্বভ্রমণের নতুন নিয়ম

নতুন বছর রান্না করুন মাটন দম বিরিয়ানি

সাফল্য পেতে বছরের শুরু থেকে বাদ দিন এই ৭ অভ্যাস

যেভাবে পারফিউম এল আমাদের জীবনে

নতুন বছরে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল পেতে চান? এভাবে যত্ন নিলে উপকার মিলবে

রাজদরবার থেকে যেভাবে সাধারণের পাতে এল নান

শীতের দিনে ঘরে মায়াবী সুগন্ধ আর পরিচ্ছন্নতার সহজ পাঠ

১০ মিনিটের ধ্যানে কমাতে পারে মানসিক চাপ