দিনভর কাজের চাপ শেষে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রল করার অভ্যাস অনেকের। সারা দিনের পর বিশ্রামের সঙ্গে খানিকটা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে অনেকেই মোবাইল ফোন বেছে নেন। তাঁদের বেশির ভাগই বুঁদ হয়ে থাকেন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন স্ক্রল করার পরও মন শান্ত হয় না। অদ্ভুত এক ভারী ভাব কাজ করে। শরীর ক্লান্ত লাগে, মাথা ঝিমুনি ধরে, আবার ঘুমও আসে না।
মানুষের মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায় তখনই, যখন চারপাশের উত্তেজনা কমে। নীরব পরিবেশ মস্তিষ্ক শান্ত হতে সাহায্য করে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলেই নতুন খবর, ছবি, ভিডিও, মতামত সামনে আসতে থাকে। সেগুলো দেখতে গিয়ে মস্তিষ্ক এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম পায় না। বিশ্রামের সময়ও সে তথ্য গ্রহণ করতে থাকে, বিচার করতে থাকে, তুলনা করতে থাকে। ফলে মস্তিষ্ক শান্ত হওয়ার বদলে আরও সজাগ হয়ে ওঠে।
এ কারণেই দীর্ঘ সময় স্ক্রল করার পর মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেকের মাথা ঝাপসা লাগে, মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়। এটাকেই অনেকে ব্রেন ফগ বলে অনুভব করেন।
এই মানসিক ক্লান্তি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ২০ বছর থেকে ৩০ বছরের কোঠায় থাকা কর্মজীবী মানুষের মধ্যে। এ বয়সে সাধারণত কাজের চাপ বেশি থাকে। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে। নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদও থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সে চাপগুলো আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্রামের সময়ও চোখে পড়ে অন্যের সাফল্য, অর্জন, ব্যস্ত জীবন। মন তখন নিজের অগ্রগতি মাপতে শুরু করে, তুলনা করতে থাকে। বাইরে থেকে বিশ্রাম মনে হলেও ভেতরে-ভেতরে চাপ চলতেই থাকে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে বোঝা যায়। ঘুমের সমস্যা হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ক্লান্ত লাগে। আবেগ আর আগের মতো কাজ করে না। মনোযোগ দ্রুত ভেঙে যায়।
অনেকেই বলেন, তাঁরা রাতে অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছেন, তবু সকালে মাথা হালকা লাগছে না। এর বড় কারণ, আগের রাতে মস্তিষ্ক আসলে বিশ্রাম পায়নি। রাতে স্ক্রল করার সময় মস্তিষ্ক সজাগ অবস্থায় থাকে। ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে। ফলে শরীর ঘুমালেও মস্তিষ্ক পুরোপুরি বন্ধ হতে পারে না। এর ফলেই সকালে ঝিমুনি, ভারী ভাব আর মনোযোগের অভাব দেখা দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মস্তিষ্কে ক্ষণস্থায়ী আনন্দ তৈরি করে। নতুন কিছু দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভালো লাগার অনুভূতি আসে। মস্তিষ্ক তখন আরও নতুন কিছু চায়। সমস্যা হলো, এই আনন্দ খুব অল্প সময়ের। কিন্তু মস্তিষ্ক সেটার খোঁজে বারবার স্ক্রল করতে থাকে। এমনকি যখন আর ভালো লাগছে না, তখনো থামা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্রামের বদলে মানুষ পড়ে যায় একধরনের অভ্যাসগত ক্লান্তির চক্রে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়াতেই এ সমস্যার সমাধান লুকিয়ে নেই। উচিত হলো, এটাকে বিশ্রামের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার না করা। কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোন না ধরাই ভালো। এর বদলে কিছু সময় হাঁটলে, শরীর নড়াচড়া করলে বা চুপচাপ বসে থাকলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। ঘরের কিছু জায়গা স্ক্রিনমুক্ত রাখা খুব কাজে দেয়। খাবার টেবিল বা শোয়ার ঘরে যদি কোনো স্ক্রিন না থাকে, তাহলে এর প্রভাব মস্তিষ্ককে শান্ত রাখে।
স্ক্রল করার সময় নিজেকে প্রশ্ন করা জরুরি, আমি কি বিশ্রাম নিচ্ছি, নাকি অস্বস্তি থেকে পালাচ্ছি। এ প্রশ্ন অনেক সময় অকারণ স্ক্রল থামিয়ে দিতে পারে। ঘুমের অন্তত ১ ঘণ্টা আগে স্ক্রিন এড়িয়ে চলা সবচেয়ে উপকারী। এর বদলে বই পড়া, হালকা গান শোনা বা সঠিক শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার দিকে মনোযোগী হলে মস্তিষ্ক সত্যিকারের বিশ্রাম পায়।
দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্ত লাগা, আবেগহীনতা, খারাপ ঘুম আর মনোযোগের অভাব কোনো দুর্বলতা নয়। এগুলো মস্তিষ্কের সতর্কসংকেত। সময়মতো বুঝতে পারলে বড় ধরনের মানসিক অবসাদ এড়ানো সম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সময় কাটানোর মাধ্যম হতে পারে; কিন্তু বিশ্রামের জায়গা নয়। মস্তিষ্কের জন্য সত্যিকারের বিশ্রাম মানে নীরবে বিশ্রাম নেওয়া। মস্তিষ্ক সে সুযোগ যত বেশি পাবে, ততই ক্লান্তি কমবে।
সূত্র: হেলথশট