ডেটা অ্যানালিটিকসের আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করছেন তানভীর রহমান। তিনি তানভীর একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা। কনসালট্যান্সি সেবা দিয়ে আসছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাদিম মজিদ।
আমার পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু ২০০৮ সালে। পরবর্তী সময়ে প্রায় ১৪ বছর বিক্রয়, বিপণন ও বিতরণ বিভাগে কাজ করেছি। দীর্ঘ করপোরেট জীবনে ব্যবসাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেলস টার্গেট, মার্কেট পারফরম্যান্স, গ্রাহকের আচরণ, আয়-ব্যয় ও লাভ—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে ডেটার সম্পর্ক রয়েছে। কাজ করতে করতেই উপলব্ধি করি, ডেটা থেকে অর্থবহ তথ্য বের করে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই মূল বিষয়। সেখান থেকে মাইক্রোসফট এক্সেল, বিজনেস ইন্টেলিজেন্স ও ডেটা অ্যানালিটিকসের প্রতি আমার আগ্রহ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে এসব বিষয়ে গভীরভাবে শেখা, হাতে-কলমে কাজ করা এবং অন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত হই। ২০২২ সালে করপোরেট চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন কনসালট্যান্ট, প্রশিক্ষক ও ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। তাই এটিকে পুরোপুরি ক্যারিয়ার পরিবর্তন নয়, বরং পূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রযুক্তি ও ডেটা অ্যানালিটিকসের সমন্বয় হিসেবে দেখি।
ডেটা অ্যানালিটিকস ও বিজনেস ইন্টেলিজেন্স নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে কনসালট্যান্সি সেবা দেওয়ার পাশাপাশি তানভীর একাডেমির ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছি। স্পেনে বসেও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করতে পারছি। আমাদের লাইভ অনলাইন প্রশিক্ষণ, রেকর্ডেড রিসোর্স ও ডিজিটাল কমিউনিটির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ যুক্ত হচ্ছেন।
এমভিপির পূর্ণরূপ মাইক্রোসফট মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্রফেশনাল। এটি মাইক্রোসফটের একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বিভিন্ন মাইক্রোসফট প্রযুক্তিতে দক্ষতার পাশাপাশি কমিউনিটিতে ধারাবাহিক জ্ঞান শেয়ারিং এবং অর্থবহ অবদানের জন্য পেশাজীবীদের এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কমিউনিটিতে জ্ঞান শেয়ারিং, শিক্ষামূলক কনটেন্ট, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিভিত্তিক অবদান এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আমি দীর্ঘদিন ধরে, বিশেষ করে মাইক্রোসফট এক্সেল, পাওয়ার বিআই, ডেটা অ্যানালিটিকস ও বিভিন্ন মাইক্রোসফট প্রযুক্তি নিয়ে বাংলায় শিক্ষামূলক কনটেন্ট ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছি। তানভীর একাডেমির ইউটিউব চ্যানেলে বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ৬৫ হাজার সাবস্ক্রাইবার, ফেসবুক পেজে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার ফলোয়ার এবং আমাদের ফেসবুক কমিউনিটিতে প্রায় ৬০ হাজার সদস্য রয়েছেন। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনা মূল্যে শিক্ষামূলক রিসোর্স, পেশাগত পরামর্শ ও প্রযুক্তিভিত্তিক কনটেন্ট মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।
আমি সব সময় বলি, ডেটা অ্যানালিস্ট হওয়ার জন্য শুধু কয়েকটি সফটওয়্যার শেখা যথেষ্ট নয়। একজন মানুষের মধ্যে বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনা এবং সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন। শুরুতে মাইক্রোসফট এক্সেল ভালোভাবে শেখা যেতে পারে। এরপর এসকিউএল, পাওয়ার বিআই, ডেটা ক্লিনিং, মডেলিং ও ভিজ্যুয়ালাইজেশন শেখা উচিত। ক্যারিয়ারের চাহিদা অনুযায়ী পরিসংখ্যান, পাইথন এবং এআইয়ের বিভিন্ন সরঞ্জাম শেখা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যবহারিক প্রয়োগ। শুধু কোর্স করা কিংবা সনদ সংগ্রহ করলেই হবে না। বাস্তব ডেটাসেট নিয়ে বিক্রয়, আর্থিক বা বিপণন বিশ্লেষণের মতো প্রকল্প তৈরি করতে হবে। একজন নিয়োগকর্তা বা ক্লায়েন্ট জানতে চাইবেন, আপনি কী জানেন, তার পাশাপাশি আপনার জ্ঞান ব্যবহার করে বাস্তবে কী করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট পাওয়ার জন্য লিংকডইন একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী প্ল্যাটফর্ম। আপওয়ার্ক, ফাইভারসহ বিভিন্ন মার্কেটপ্লেস থেকেও কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে আমার অভিজ্ঞতায় একটি প্ল্যাটফর্মের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড, পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা ও দৃশ্যমানতা। একটি পেশাদার লিংকডইন প্রোফাইল, পোর্টফোলিও, ওয়েবসাইট, কাজের উদাহরণ এবং নিয়মিত মানসম্মত কনটেন্ট একজন পরামর্শকের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে অনেক সাহায্য করে। দীর্ঘদিন শিক্ষামূলক কনটেন্ট এবং অনলাইন কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করায় বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের মানুষের কাছে আমার কাজ পৌঁছেছে। একটা পর্যায়ে ভালো ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরি হলে সব সময় আপনাকে ক্লায়েন্ট খুঁজতে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে আপনার কাজ ও অভিজ্ঞতা দেখে ক্লায়েন্টই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে।
প্রথমে নিজের মৌলিক দক্ষতার ওপর শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে। যে সেবা আপনি আন্তর্জাতিক বাজারে দিতে চান, সেই বিষয়ে আপনাকে অবশ্যই যোগ্য হতে হবে। তবে কারিগরি দক্ষতা একাই যথেষ্ট নয়। ইংরেজিতে যোগাযোগ, ক্লায়েন্টের চাহিদা বোঝা, উপস্থাপনা ও সময় ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি বিষয় আমি খুব গুরুত্ব দিয়ে বলি, সেটি হলো ব্যবসা বোঝা। ক্লায়েন্ট সাধারণত শুধু পাওয়ার বিআই ড্যাশবোর্ডের জন্য কনসালট্যান্ট খোঁজেন না; তাঁর কোনো ব্যবসায়িক সমস্যা থাকে। আপনি যদি সেই সমস্যা বুঝতে পারেন এবং তথ্য ব্যবহার করে কার্যকর সমাধান দিতে পারেন, তখনই আপনি শুধু একজন টুল ব্যবহারকারী না থেকে একজন পেশাদার কনসালট্যান্ট হয়ে উঠবেন। আমার নিজের পূর্ববর্তী বিক্রয়, বিপণন, বিতরণ ও হিসাবরক্ষণে অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করে।
তানভীর একাডেমি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষায় সহজ ও ব্যবহারিক পদ্ধতিতে প্রযুক্তি শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আমরা মাইক্রোসফট এক্সেল, পাওয়ার বিআই, ডেটা অ্যানালিটিকস, এসকিউএল, এআই ও বিভিন্ন পেশাগত প্রযুক্তি দক্ষতা নিয়ে নিয়মিত শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরি করছি। এর বড় একটি অংশ বিনা মূল্যে, ফলে অর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রশিক্ষণ নিতে না পারা মানুষও শেখার সুযোগ পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি তানভীর একাডেমির ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাঠামোবদ্ধ লাইভ ও রেকর্ডেড প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাভাষী শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা আমাদের কোর্সে অংশ নেন।
এআইকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে এআইয়ের সঙ্গে কাজ করা শিখতে হবে। তবে মৌলিক পেশাগত দক্ষতা বাদ দিয়ে শুধু এআইয়ের সরঞ্জাম শেখা যথেষ্ট নয়। একজন তথ্য বিশ্লেষকের এক্সেল, এসকিউএল, পাওয়ার বিআই এবং বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনা জানা প্রয়োজন। এআই কাজ দ্রুত করা, সূত্র বা কোড তৈরি এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে পারে। কিন্তু কোন প্রশ্নটি করা দরকার, তথ্য সঠিক কি না, এআইয়ের দেওয়া ফলাফল যৌক্তিক কি না এবং ব্যবসার জন্য কোন সিদ্ধান্তটি সঠিক—এসব বিবেচনা একজন দক্ষ পেশাদারকেই করতে হবে।
খুব দ্রুত সফল হওয়ার চিন্তার পরিবর্তে দীর্ঘ মেয়াদে নিজের দক্ষতা ও পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করুন। প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই একটি দক্ষতা শিখে সারা জীবন একইভাবে কাজ করার সুযোগ কমে যাচ্ছে। নিজেকে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তৈরি করুন। দক্ষতা অর্জন, ব্যবহারিক প্রকল্প, পোর্টফোলিও, যোগাযোগ দক্ষতা ও নিজের কাজ তুলে ধরার অভ্যাস তৈরি করুন। নিজেকে শুধু স্থানীয় চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করবেন না। বৈশ্বিক মানদণ্ডে দক্ষতা ও পেশাদারত্ব তৈরি করুন। এমন পেশাগত মূল্য তৈরি করুন, যার জন্য বাজার আপনাকে খুঁজবে।