যুক্তরাষ্ট্রের পারডু ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মুস্তাফা হোসাইন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনে কাজ করছেন। বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ সিলিকন রিভার ও বিয়ারের প্রধান স্থপতি তিনি। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাদিম মজিদ।
বুয়েট থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় মাস্টার্স করি। পরে ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন থেকে পিএইচডি করি।
শিক্ষকতার আগে টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস ও সেমাটেকের সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছি। ২০০৯ সালে সৌদি আরবের কিং আবদুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে অধ্যাপনা শুরু করি। ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলিতে অধ্যাপক হিসেবেও যুক্ত ছিলাম। ২০২২ সাল থেকে পারডু ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করছি।
তাইওয়ানের ইতিহাস আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। তারা এক দিনে এই অবস্থানে পৌঁছায়নি। প্রথমে দক্ষ মানুষ তৈরি করেছে, বিদেশ থেকে প্রযুক্তি শিখেছে, দেশে ফিরে সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে শিল্প গড়ে তুলেছে।
১৯৭০-এর দশকে তাইওয়ানের ১৯ জন প্রকৌশলীকে যুক্তরাষ্ট্রের আরসিএতে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের অর্জিত অভিজ্ঞতা তাইওয়ানের প্রাথমিক সেমিকন্ডাক্টর সক্ষমতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরে আইটিআরআই, ইউএমসি ও টিএসএমসির মতো প্রতিষ্ঠান সেই ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। বিশেষ করে টিএসএমসি ফাউন্ড্রি ব্যবসায়িক মডেল ডিসাইনভিত্তিক দেশগুলোর জন্য নির্ভরযোগ্য উৎপাদন অংশীদার হয়ে ওঠে। দক্ষতা, শৃঙ্খলা, গুণমান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং গ্রাহকের আস্থা অর্জনই তাইওয়ানের শক্তি।
বাংলাদেশ এখনো এই শিল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আমাদের হিসাবে দেশে প্রায় ১ হাজার ২০০ পেশাজীবী সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরও তিন হাজারের বেশি অভিজ্ঞ পেশাজীবী রয়েছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশের কাজ প্রধানত চিপ ডিজাইন ও সংশ্লিষ্ট সেবাকেন্দ্রিক। কিন্তু শুধু ডিজাইনে সীমাবদ্ধ থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে বড় শিল্প গড়ে তোলা কঠিন।
আমাদের ডিজাইনের পাশাপাশি এআইভিত্তিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল টুইন, চিপ অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং, অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং, মেমোরি, গবেষণা, মেধাস্বত্ব এবং নিজস্ব পণ্য তৈরিতে এগোতে হবে।
সব কাজ একসঙ্গে শুরু করার প্রয়োজন নেই। যেসব ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে দক্ষতা ও গ্রাহক তৈরি করা সম্ভব, সেখান থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে কিন্তু দ্রুত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি তরুণ রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী ইইই ও সিএসই থেকে স্নাতক হচ্ছে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট হাই। খরচ অনেক কম। এখন এদের অস্বাভাবিক দক্ষ ট্যালেন্ট ফোর্সে পরিণত করতে হবে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে পানি, জমি, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে এসবের কিছু সুবিধা রয়েছে, কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন কারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উচ্চমানের পানি, নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।
লোডশেডিং আছে বলেই ফ্যাব করা অসম্ভব, এমন সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলে ডেডিকেটেড বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিকল্প সংযোগ, স্মার্ট গ্রিড, রিনিউঅ্যাবল, ব্যাটারি, ব্যাকআপ জেনারেশনের সমন্বয়ে উচ্চ নির্ভরযোগ্যতার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সৃজনশীল সমাধান, এগিয়ে চলার সাহস। ভয়, শঙ্কা, সন্দেহ, গড়িমসি, আলস্য, দুর্নীতি নয়।
আন্তর্জাতিক শিল্পে বিনিয়োগ শুধু আবেগ বা দেশপ্রেমের ভিত্তিতে হয় না। কোম্পানি দেখে দক্ষ জনবল, গুণমান, সময়মতো কাজ শেষ করার সক্ষমতা, মেধাস্বত্বের সুরক্ষা, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং গ্রাহক পাওয়ার সম্ভাবনা।
প্রবাসী বাংলাদেশি পেশাজীবীরা এখানে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারেন। তাঁরা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য গ্রাহক তৈরিতে সাহায্য করতে পারেন।
আমাদের এমন সক্ষমতা দেখাতে হবে, যাতে বাংলাদেশে কাজ করা তাঁদের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও লাভজনক হয়। প্রথমে ছোট যৌথ প্রকল্পে আস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। একটি সফল পণ্য, একটি নির্ভরযোগ্য প্রকৌশলী দল কিংবা একটি আন্তর্জাতিক গ্রাহক পরবর্তী বড় বিনিয়োগের পথ খুলে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে যে যত বড়ই হোক তার ইচ্ছে না থাকলে তার অবদান শূন্য।
যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি দেখিয়েছে, মানুষের মেধা ও উদ্ভাবন কীভাবে বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করতে পারে। ২০২৫ সালের সিলিকন ভ্যালি ইনডেক্স অনুযায়ী, অঞ্চলটির ২০২৪ সালের বার্ষিক জিডিপি প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে সেখানে প্রায় ১৭ লাখ কর্মসংস্থানের চিত্র পাওয়া যায়।
একটি সীমিত ভৌগোলিক অঞ্চলে এত বিপুল অর্থনৈতিক কার্যক্রম আমাদের ভাবতে শেখায়। প্রাকৃতিক সম্পদ বা বিশাল জনসংখ্যা ছাড়াও জ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংগঠিত উদ্যোগ অর্থনীতিকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে!
সিলিকন ভ্যালির সাফল্য কোনো একটি কোম্পানি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, দক্ষ পেশাজীবী এবং বৈশ্বিক গ্রাহকদের সমন্বয়ে সেখানে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে।
আমাদের সিলিকন রিভারের দর্শনও এখানেই। বাংলাদেশে এমন পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে শিক্ষার্থীর ধারণা গবেষণায়, গবেষণা প্রযুক্তিতে, প্রযুক্তি পণ্যে এবং পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাবে।
দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির পাশাপাশি নিজেদের মেধা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে অপরিহার্য হয়ে ওঠাই আমাদের লক্ষ্য।
আমার লক্ষ্য এমন একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যেখানে বাংলাদেশিরা নিজেরাই নতুন প্রযুক্তি, মেধাস্বত্ব, পণ্য ও কোম্পানি তৈরি করতে পারবেন। আমাদের একটি হিসাব রয়েছে। সাড়ে ছয় কোটি তরুণের মধ্যে প্রতি এক লাখে একজন করে ৬৫০ জন অসাধারণ উদ্ভাবনী নেতৃত্ব তৈরি করতে চাই। তাঁদের মধ্যে ছয়টি গুণ দেখতে চাই: শৃঙ্খলা, সাংগঠনিক দক্ষতা, লক্ষ্যস্থিরতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীল সমাধান তৈরির ক্ষমতা এবং কার্যকর যোগাযোগদক্ষতা।
এই ৬৫০ জনের প্রত্যেকে যদি ৩০ জন বিশেষায়িত প্রযুক্তিবিদকে নেতৃত্ব দেন, তাহলে ১৯ হাজার ৫০০ জনের একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি দল তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে উৎপাদন, সেবা, সরবরাহ ও অন্যান্য সহযোগী খাতেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমাদের আকাঙ্ক্ষা ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর মূল্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা।
আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলিকন রিভার স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চ গড়ে তুলছি। ইতিমধ্যে ৬০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যুক্ত হয়েছেন। তাঁরা প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, দক্ষতা উন্নয়ন, সমস্যা চিহ্নিতকরণ, গবেষণা এবং সৃজনশীল সমাধান নিয়ে কাজ করবেন। সিলিকন রিভার স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের ফেসবুক পেজ থেকে আগ্রহীরা তথ্য পেতে ও যোগাযোগ করতে পারবেন। আমাদের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানকারী ও ভবিষ্যৎ উদ্ভাবক হিসেবে প্রস্তুত করা।
প্রথমত, প্রস্তুতি আগে থেকে নিতে হবে। স্নাতক শেষ হওয়ার অপেক্ষা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী আইইএলটিএস/টোয়েফল, জিআরই পরীক্ষা, গবেষণার অভিজ্ঞতা, শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আবেদনপত্র তৈরির কাজ শুরু করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, মাস্টার্স এবং পিএইচডি বিরতিহীনভাবে শেষ করা। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের আগ্রহের বিষয়টি বোঝা, মৌলিক জ্ঞান শক্তিশালী করা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখা। ডিগ্রি অর্জনই শেষ লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। অর্জিত জ্ঞান দিয়ে নতুন কী তৈরি করতে পারলাম, মানুষের কোন সমস্যার সমাধান করলাম, সেটিই বড় প্রশ্ন।