কর্মক্ষেত্রে এক জায়গায় আটকে থাকা অনেকের কাছে হতাশাজনক। পদোন্নতি হচ্ছে না, বেতন বাড়ছে না—এমন পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাসও কমে যেতে পারে। কিন্তু পরিকল্পিত প্রস্তুতি, সঠিক কৌশল ও দৃঢ় মনোভাব থাকলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে জেনে নিন, কীভাবে নিজেকে সব সময় এগিয়ে রাখা যায়।
নিজেকে প্রতিষ্ঠা করুন
নটিংহ্যামভিত্তিক ক্যারিয়ার কোচ জন ব্রাউন বলেন, ‘পদোন্নতির মূল রহস্য হলো আগেভাগেই বীজ বপন করা। আপনার বর্তমান কাজ নিখুঁতভাবে করুন, সময়মতো লক্ষ্য পূরণ করুন এবং “কাজ সম্পাদনকারী” হিসেবে পরিচিতি গড়ে তুলুন।’
তিনি সতর্ক করেন, সবকিছুতে ‘হ্যাঁ’ বলার অভ্যাস বিপজ্জনক হতে পারে। অযৌক্তিক কাজ নিলে ব্যর্থতার ঝুঁকিও বাড়ে।
ব্যাংককভিত্তিক ক্যারিয়ার কোচ টেসা গ্রিন্ট যোগ করেন, ‘পদোন্নতির আগে আপনাকে নেতা হিসেবে ভাবতে ও আচরণ করতে হবে। পদোন্নতি হলো আপনার নেতৃত্বের স্বীকৃতি।’
বসের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করুন
ব্রাউনের মতে, ‘আপনার বসই সবচেয়ে বড় সমর্থক হতে পারেন।’ তাই নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন, প্রয়োজনে বাড়তি দায়িত্ব নিন এবং ভালো-মন্দ সব তথ্যই সময়মতো জানান। গ্রিন্ট বলেন, ‘যদি নিয়মিত ক্যারিয়ার আলোচনা না হয়, নিজেই উদ্যোগ নিন। আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আগ্রহ স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন।’
নিজের দৃশ্যমানতা বাড়ান
লন্ডনভিত্তিক নির্বাহী কোচ ও ‘প্রজেক্ট ২৩’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এলেইন দেলা ক্রুজ বলেন, ‘ক্যারিয়ার অগ্রগতির জন্য দৃশ্যমানতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ আপনার সম্পর্কে কী ভাবছে, সেটি সচেতনভাবে তৈরি করতে হবে।’
তিনি পরামর্শ দেন, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিন, প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করুন এবং নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে অতিরিক্ত কার্যক্রমে যুক্ত থাকুন। অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি নয়, তবে সুযোগ এলে পিছিয়ে থাকবেন না।
নিজের সাফল্যের কথা জানান
অনেকে নিজের কাজের কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু করপোরেট জগতে এটি অপরিহার্য। ব্রাউন বলেন, ‘আপনি কী করেছেন, কেন করেছেন, কী শিখেছেন এবং সামনে কী করবেন—এসব পরিষ্কারভাবে তুলে ধরুন। পাশাপাশি দলকে কৃতিত্ব দিন। এতে নেতৃত্বের গুণ প্রকাশ পায়।’
‘ব্যস্ত’ নয়, উৎপাদনশীল হোন
গ্রিন্ট বলেন, ‘সবাই ব্যস্ত, কিন্তু সবাই উৎপাদনশীল নয়।’ অপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো কাজে নিজেকে আটকে রাখলে বড় কাজের সুযোগ হারাতে পারেন।
ব্রাউন মনে করিয়ে দেন, ‘অফিসে বেশি সময় থাকা নয়, বরং সময়মতো মানসম্মত কাজ শেষ করাই আসল বিষয়।’ কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখুন।
নেটওয়ার্কিংয়ে গুরুত্ব দিন
ব্রাউনের ভাষায়, ‘নেটওয়ার্কিং মানে সম্পর্ক তৈরি করা—যেখানে আপনার দক্ষতা ও আগ্রহ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে। লিংকডইন শুধু একটি মাধ্যম।’
দেলা ক্রুজ বলেন, ‘পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি আপনার ব্যক্তিত্বের দিকটিও তুলে ধরুন। এতে আপনাকে আলাদা করে চেনা যায়।’
কাঙ্ক্ষিত পদে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলুন
গ্রিন্টের পরামর্শ, ‘যে পদে যেতে চান, সেখানে যাঁরা আছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে কার্যকর ধারণা পাবেন।’
দেলা ক্রুজ এটিকে বলেন ‘ব্যক্তিগত বোর্ডরুম’ তৈরি করা—একটি সমর্থনশীল নেটওয়ার্ক, যারা আপনাকে গঠনমূলক পরামর্শ দেবে।
বেতন আলোচনায় প্রস্তুত থাকুন
গ্রিন্ট বলেন, ‘বেতন নিয়ে আলোচনায় ডেটা নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। বাজারে একই পদে কত বেতন দেওয়া হয়, তা জেনে নিন।’
দেলা ক্রুজের পরামর্শ, ‘সাহস করে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য অঙ্ক দাবি করুন এবং আপনার কাজের প্রভাব দিয়ে তা সমর্থন করুন। এটি ভবিষ্যৎ অবদানকেও বিবেচনায় আনে।’
‘শুষ্ক পদোন্নতি’ হলে ভাবুন
দায়িত্ব বাড়ল, কিন্তু বেতন বাড়ল না—এমন পরিস্থিতিকে অনেকে ‘শুষ্ক পদোন্নতি’ বলেন। ব্রাউন বলেন, ‘নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনি কি অর্থের জন্য কাজ করছেন, নাকি অভিজ্ঞতার জন্য?’ যদি অর্থ গুরুত্বপূর্ণ হয়, ভবিষ্যৎ বেতন পর্যালোচনার সময়সীমা লিখিতভাবে নিশ্চিত করুন।
নিজের যত্ন নিন
গ্রিন্টের মতে, ‘শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য সম্ভব নয়।’ নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।
তিনি আরও বলেন, একটি বাস্তবসম্মত সকালের রুটিন গড়ে তুলুন, যা আপনাকে প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখবে।
বারবার উপেক্ষিত হলে কী করবেন
দেলা ক্রুজ বলেন, সামাজিক বা অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধির আবেদন করা ঠিক নয়।
ব্রাউনের পরামর্শ, ‘সৎ প্রতিক্রিয়া নিন এবং নিজের ক্যারিয়ার অডিট করুন। কোথায় আছেন, কোথায় যেতে চান—এই ফাঁক বিশ্লেষণ করুন। প্রয়োজনে নতুন প্রতিষ্ঠানে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করুন।’
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান