হোম > ইসলাম

আপনার জিজ্ঞাসা

ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল ও মুস্তাহাবের পার্থক্য কী?

মুফতি হাসান আরিফ

নামাজের পর দোয়া করছেন এক মুসল্লি। ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

প্রশ্ন: ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল, মুস্তাহাব, মুবাহ, হারাম ও মাকরুহর মধ্যে পার্থক্য কী? জানতে চাই।

ফারুক হোসেন, সিরাজগঞ্জ

উত্তর: ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল কিংবা মুস্তাহাব—এ পরিভাষাগুলো সরাসরি আল্লাহ তাআলা বা তাঁর রাসুল (সা.) নির্ধারিত করে যাননি। বরং কোরআন-সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস সম্পর্কে বিজ্ঞ ফকিহ ও মুজতাহিদ ইমামগণ গবেষণা করে এই পরিভাষাগুলো নির্ধারণ করেছেন।

১. ফরজ

শরিয়তের যেসব আদেশ অকাট্য দলিল (কোরআন বা সুসংহত হাদিস) দ্বারা প্রমাণিত এবং যার মধ্যে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, তাকে ফরজ বলে। এটি পালন করা বাধ্যতামূলক। ওজর ছাড়া পরিত্যাগকারী মারাত্মক গোনাহগার বা ফাসিক। ফরজ অস্বীকারকারী ব্যক্তি ইসলাম থেকে খারিজ বা ‘কাফির’ বলে গণ্য হয়।

যা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর ব্যক্তিগতভাবে ফরজ (যেমন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, জাকাত, হজ) তাকে ফরজে আইন বলে। আর যা সমাজের কিছু লোক আদায় করলে সবাই দায়িত্বমুক্ত হয়, কিন্তু কেউ না করলে সবাই গোনাহগার হয় (যেমন, জানাজার নামাজ, দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান অর্জন, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে বাধা প্রদান) তাকে ফরজে কিফায়া বলে।

২. ওয়াজিব

যা পালন করার নির্দেশটি ফরজের তুলনায় সামান্য কম শক্তিশালী দলিল দ্বারা প্রমাণিত, তাকে ওয়াজিব বলে। যেমন, বিতর নামাজ, ঈদের নামাজ, সদকাতুল ফিতর ও কোরবানি।

ওয়াজিবের ওপর আমল করা অপরিহার্য। বিনা ওজরে ত্যাগকারী গোনাহগার হবে। ওয়াজিব অস্বীকারকারী ‘ফাসিক’ বা গোমরাহ হিসেবে গণ্য হলেও তাকে কাফির বলা যায় না। এটিই জমহুর ফকিহদের কাছে ফরজ ও ওয়াজিবের মূল পার্থক্য। (তবে কোনো কোনো ফকিহ ফরজ ও ওয়াজিবকে একই স্তরে গণ্য করেছেন)।

৩. সুন্নত

যা ফরজ বা ওয়াজিবের মতো কঠোরভাবে অপরিহার্য নয়, তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্বীনের তাগিদে তা পালন করেছেন বা করতে উৎসাহিত করেছেন, তাকে সুন্নত বলে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) যেসব কাজ নিয়মিত ইবাদত হিসেবে করেছেন এবং ওজর ছাড়া কখনো ছাড়েননি, তাকে সুন্নতে মুআক্কাদা বলে। এটি ওয়াজিবের কাছাকাছি গুরুত্ব বহন করে। ফরজ নামাজের আগের ও পরের নির্দিষ্ট সুন্নত, আজান দেওয়া, পুরুষদের জামাতে নামাজ আদায় করা। বিনা ওজরে এটি বারবার ছেড়ে দেওয়া গোনাহ।

যা রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত করতেন, তবে মাঝে মাঝে ওজর ছাড়াই ছেড়ে দিতেন, তাকে সুন্নতে জায়েদা বলে। যেমন, আসরের আগের ৪ রাকাত সুন্নত, তাহাজ্জুদসহ অন্যান্য নফল নামাজ।

৪. মুস্তাহাব ও নফল

মুস্তাহাব অর্থ পছন্দনীয় বা উত্তম। যে আমল করলে অশেষ সওয়াব পাওয়া যায়, কিন্তু না করলে কোনো গোনাহ বা তিরস্কার নেই। অনেক আলেমের মতে নফল, মুস্তাহাব, মানদুব ও সুন্নতে জায়েদা মূলত কাছাকাছি অর্থবোধক। ফরজ ও ওয়াজিবের বাইরে অতিরিক্ত সব ভালো কাজই নফলের অন্তর্ভুক্ত।

৫. হারাম ও মাকরুহ

নিষেধসূচক বিধানের ক্ষেত্রেও স্তরবিন্যাস রয়েছে:

  • হারাম: ফরজের বিপরীত, যা অকাট্য দলিল দ্বারা নিষিদ্ধ। এতে লিপ্ত ব্যক্তি ফাসিক ও শাস্তির যোগ্য এবং একে হালাল মনে করে অস্বীকারকারী কাফির। যেমন, সুদ, ব্যভিচার, চুরি, অন্যায় হত্যা হারাম।
  • মাকরুহে তাহরিমি: ওয়াজিবের বিপরীত। হারামের কাছাকাছি নিষিদ্ধ কাজ। এতে লিপ্ত ব্যক্তি গোনাহগার হবে।
  • মাকরুহে তানজিহি: সুন্নতে জায়েদা বা মুস্তাহাবের বিপরীত। যা থেকে বেঁচে থাকা উত্তম, কিন্তু লিপ্ত হলে গোনাহ বা তিরস্কারের পাত্র হতে হয় না।

৬. মুবাহ

যেসব কাজে শরিয়তের পক্ষ থেকে আদেশ বা নিষেধ কোনোটিই দেওয়া হয়নি, তাকে মুবাহ বা জায়েজ বলে। সাধারণ পার্থিব কাজকর্ম মুবাহ। তবে ভালো নিয়তের কারণে মুবাহ কাজও মুস্তাহাব বা সওয়াবের কাজে পরিণত হতে পারে।

উত্তর দিয়েছেন, মুফতি হাসান আরিফ, ইসলামবিষয়ক গবেষক