রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুরো জীবনটাই ছিল বিশ্বমানবতার জন্য এক অনন্য শিক্ষালয়। তিনি কেবল অনুসারী সাহাবিদেরই পরম মমতায় ভালোবাসেননি; বরং যারা তাঁকে অপমান করেছে, আঘাত হেনেছে এবং তাঁর পথে চরম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—তাদের প্রতিও দেখিয়েছেন ক্ষমা, ধৈর্য ও মহানুভবতার এক রূপকথা-তুল্য দৃষ্টান্ত।
উদ্বেগ আর আশার দোলাচলে তাঁর জীবনের এমনই এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল তায়েফের প্রান্তর।
মক্কার কুরাইশদের নির্যাতন ও দাওয়াত প্রত্যাখ্যানে ব্যথিত হয়ে প্রিয় নবীজি (সা.) তায়েফে গমনের সিদ্ধান্ত নেন। আশা ছিল, সেখানকার মানুষ হয়তো পরম রবের ঐশ্বরিক বার্তায় সাড়া দেবে। কিন্তু বাস্তবতার চিত্রটি হয়ে দাঁড়াল অত্যন্ত মর্মান্তিক। তায়েফের নেতারা কেবল তাঁর দাওয়াতকেই প্রত্যাখ্যান করল না, বরং তাঁকে চরম উপহাস করে শহরের উচ্ছৃঙ্খল লোক ও পথশিশুদের লেলিয়ে দিল তাঁর পেছনে। অবিরত পাথর বর্ষণে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে উঠল।
অবসন্ন ও ক্ষতবিক্ষত দেহে তিনি একটি আঙুর বাগানে আশ্রয় নিলেন। কিন্তু হৃদয়ের এমন চরম যন্ত্রণাময় মুহূর্তেও তিনি কিন্তু প্রতিশোধের কথা ভাবেননি!
হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা এসে আরজ করলেন—‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনি নির্দেশ দিলে এই তায়েফবাসীকে দুই পাহাড়ের মাঝখানে পিষে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’ কিন্তু রহমতের নবী (সা.) প্রতিশোধের সুযোগ ফিরিয়ে দিলেন নিমেষেই। তিনি অত্যন্ত কোমল কণ্ঠে বললেন, ‘না, আমি তা চাই না। বরং আমি আশা করি, আল্লাহ এদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে।’
কী অসীম ক্ষমা! কী অনুপম মমতা! যারা শরীর রক্তাক্ত করেছিল, তাদেরই হিদায়াত ও কল্যাণের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন তিনি। যার হাতে ছিল ধ্বংস ডেকে আনার ক্ষমতা, তিনি বেছে নিলেন দয়া ও শুভকামনা। তায়েফের ঐতিহাসিক এ ঘটনা আমাদের শেখায়—প্রকৃত শক্তি প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্যে নয়, বরং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়ার মহান উদারতায়।