আপনার জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: খুশি কিংবা আনন্দের সংবাদ শুনে আল্লাহর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সিজদা দেওয়ার বিধান কী? এভাবে সিজদা করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা কি জায়েজ? বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।
সাগর হাসান, নারায়ণগঞ্জ
উত্তর: সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অপ্রত্যাশিত কোনো আনন্দ বা বহুল প্রত্যাশিত কোনো সাফল্যের সংবাদে আমরা উৎফুল্ল হই এবং আনন্দ প্রকাশ করি। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, যেকোনো আনন্দের মুহূর্তে উৎফুল্লতার আতিশয্যে অহংকারী না হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতায় অবনত হতে। এটিই একজন খাঁটি মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কোনো নিয়ামত লাভ করার পর সবচেয়ে বড় কৃতজ্ঞতা হলো সেই নিয়ামতের খেয়ানত না করা। তবে তাৎক্ষণিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নানা পদ্ধতি রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ১. আলহামদুলিল্লাহ বলে মুখে আল্লাহর প্রশংসা করা। ২. সালাতুশ শোকর আদায় করা অর্থাৎ শুকরিয়াস্বরূপ নফল নামাজ আদায় করা। ৩. সিজদায়ে শোকর আদায় করা অর্থাৎ শুকরিয়াস্বরূপ শুধু সিজদা দেওয়া।
ওপরের তিনটি পদ্ধতিই কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সঠিক। এর মধ্যে প্রথম দুটি পদ্ধতি বহুল প্রচলিত এবং স্পষ্ট; তবে তৃতীয় বিষয়টি একটু আলোচনা সাপেক্ষ।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনীর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে সিজদায়ে শোকর নবীজি (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল ছিল। হাদিস শরিফে এসেছে—বিখ্যাত সাহাবি আবু বাকরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কোনো আনন্দের ঘটনা ঘটলে বা কোনো খুশির সংবাদ পেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে সিজদায় লুটিয়ে পড়তেন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৭৭৪)
নবীজি (সা.)-এর অনুকরণে সাহাবায়ে কেরামও জীবনের বিভিন্ন আনন্দের মুহূর্তে শুকরিয়ার সিজদা আদায় করতেন। যেমন বিখ্যাত সাহাবি কাব বিন মালেক (রা.) যখন জানতে পারলেন যে আল্লাহ তাআলা তাঁর তওবা কবুল করেছেন, তখন তিনি খুশিতে তাৎক্ষণিক সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন। (সহিহ বুখারি: ৪৪১৮; সহিহ মুসলিম: ২৭৬৯)
এ ছাড়া বিভিন্ন যুদ্ধে বিজয়ের সংবাদ শুনে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) এবং চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর সিজদা করার কথাও ইতিহাসে পাওয়া যায়।
জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে, সিজদায়ে শোকর আদায় করা একটি মুস্তাহাব আমল। শুকরিয়াস্বরূপ এই সিজদা করা নফল নামাজের সমপর্যায়ের। তাই নামাজের জন্য যেসব শর্ত প্রযোজ্য, এই সিজদার জন্যও সেসব শর্ত পূরণ করা আবশ্যক। যেমন: ক. শরীর, পরিধেয় কাপড় ও সিজদার স্থান পবিত্র হওয়া। খ. সতর ঢাকা থাকা। গ. কিবলামুখী হওয়া। ঘ. অজু থাকা।
যদি ওপরে বর্ণিত শর্তগুলো পাওয়া যায়, তবে কিবলামুখী হয়ে সিজদা করা মুস্তাহাব। আর যদি এসব শর্ত না পাওয়া যায় (যেমন অজু না থাকা বা সতর ঢাকা না থাকা), তবে আবেগের বশবর্তী হয়ে অজ্ঞতাবশত সিজদা দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। বরং এ ক্ষেত্রে অন্তরের গভীর থেকে আল্লাহর প্রশংসা ও মৌখিকভাবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে।
তথ্যসূত্র: ফতোয়ায়ে শামি: ৪/৬০৯; আল মুগনি: ১/৬২৯; হাসিয়াতুত তাহতাবি আলা মারাকিল ফালাহ: পৃষ্ঠা ৫০০
উত্তর দিয়েছেন: মুফতি মুহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া, শিক্ষক, জামিয়া আল-ইহসান, ঢাকা