মরুভূমির বালুকাবেলা যেন আজও ধারণ করে আছে সুদূর অতীতের সোনালি ইমানি ইতিহাস। সৌদি আরবের আল-বাহা অঞ্চলের আল-মাআল্লামাহ্ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে সন্ধান মিলেছে ১৩০০ বছরের পুরোনো এক ঐতিহাসিক মসজিদের, যার কিবলার দেয়ালে খোদাই করা রয়েছে আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দরুদমাখা এক অনন্য শিলালিপি।
সৌদি হেরিটেজ কমিশনের প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের চতুর্থ মৌসুমে আবিষ্কৃত হয় এই প্রাচীন ইবাদতখানাটি। মসজিদটি মূলত হিজরি প্রথম শতাব্দীর, যা আজ থেকে প্রায় ১৩০০ বছরেরও বেশি আগের স্মৃতি বহন করছে।
মসজিদটির সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক হলো এর কিবলার দেয়াল। সেখানে অত্যন্ত নিখুঁত ও ভক্তিভরে লেখা রয়েছে মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও দোয়ার বাণী:
‘অনন্ত রহমত বর্ষিত হোক মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর ওপর—যিনি পুণ্যবান, মনোনীত এবং সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ মানব। হে সত্যের মাবুদ, বিশ্বজগতের প্রতিপালক, আপনি আমাদের প্রার্থনা কবুল করুন।’
মরুভূমির প্রাচীন পাথরে খোদাই করা এই একটি বাক্য যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও একাত্ম করে দেয় সাহাবি ও তাবেয়িদের জামানার সেই রুহানি আবেশকে।
গ্রানাইট পাথর কেটে কেটে তৈরি করা হয়েছিল এই সুপ্রাচীন ইবাদতগাহ। বাহ্যিক রূপ বেশ সাধারণ হলেও এর স্থাপত্যে ছিল অপার নিখুঁতভাব। কিবলামুখী মেহরাব, সুবিন্যস্ত প্রবেশদ্বার এবং দাঁড়িয়ে থাকা মিনারটি যেন নীরবে জানান দেয় প্রথম যুগের মুসলমানদের বিনম্র ইবাদতের চিত্র। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে এটি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৬ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১০ মিটার বিস্তৃত।
মসজিদ প্রাঙ্গণ ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে পাথরের তৈরি বেশ কিছু কক্ষ। ইতিহাসবিদদের ধারণা, কেবল সালাতের জন্যই নয়, এলাকাটির সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের মূল স্পন্দন ছিল এই জায়গাটি। খাদ্যশস্য সংরক্ষণের জন্য মাটির পাত্র, পানির আধার ও পাথরের তৈরি গৃহস্থালি সরঞ্জাম ইঙ্গিত দেয়—শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এই আঙিনাকে ঘিরেই আবর্তিত হতো তৎকালীন মানুষদের জীবন।
খননকালে উদ্ধার হওয়া পাথরের টুকরা, মাটির পাত্রের ভগ্নাংশ, শস্য পেষার জাঁতা এবং হামানদিস্তা প্রমাণ করে সেকালের সাধারণ ও সহজ-সরল জীবনযাত্রার চিত্র। শুধু তা-ই নয়, এই প্রাঙ্গণে পাওয়া গেছে সোনা, রুপা ও তামা উত্তোলনের সুপ্রাচীন নমুনাও। ইতিহাসবিদেরা মনে করছেন, প্রথম ইসলামি যুগে আল-মাআল্লামাহ্ অঞ্চলটি কেবল ইবাদতের ক্ষেত্রই ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল হস্তশিল্পী, বণিক ও শ্রমিকের মিলনমেলা এবং ধাতব বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ কেন্দ্রবিন্দুতে।
সৌদি হেরিটেজ কমিশন জানিয়েছে, সুপ্রাচীন এই মসজিদ এবং এর চারপাশে খুঁজে পাওয়া ঐতিহাসিক উপাদানগুলো প্রথম ইসলামি যুগের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধার্মিক জীবনের এক নতুন রূপরেখা উন্মোচন করল।
ধূলিধূসরিত শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আসা এই শিলালিপি যেন আজকের প্রতিটি মুমিনের হৃদয় ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলে যায়—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি মুমিন হৃদয়ের সেই ভালোবাসা অমলিন ছিল, অমলিন আছে এবং কেয়ামত অবধি অমলিন থাকবে।
দ্য ইসলামিক ইনফরমেশন অবলম্বনে