হোম > ইসলাম

শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা

মুফতি ইবরাহীম আল খলীল

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুর নিরাপদ বেড়ে ওঠা, চরিত্র গঠন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। একজন অভিভাবক যখন সন্তানকে কোনো প্রতিষ্ঠানে পাঠান, তখন পড়াশোনার পাশাপাশি সন্তানের নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও আমানতের এক বড় অংশ তুলে দেন শিক্ষকের হাতে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে তা কেবল একটি অপরাধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না—তা শিশুর নিরাপত্তা, বিশ্বাস ও শৈশবের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত হেনে দেয়। আর এমন ঘটনা যদি হয় কোনো দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসায়, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আরও বৃহৎ আকারে।

ইসলামি দৃষ্টিতে শিশুর সুরক্ষা ও আমানতদারিতা

ইসলাম মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ও আত্মমর্যাদা সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আলে ইমরান: ৫৭)। কোনো শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন করা চরম জুলুম। কারণ, এটি তার শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদা ধ্বংস করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন চরম অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৭৮)

শিক্ষকতা একটি পবিত্র আমানত। একজন শিক্ষক যখন অর্পিত বিশ্বাসের অপব্যবহার করেন, তখন তিনি কেবল আইনই ভাঙেন না; বরং আল্লাহর দেওয়া আমানতের খেয়ানত করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা: ৫৮)। রাসুল (সা.) আরও সতর্ক করেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৯৭)

সমস্যার মূল কারণ

এই অপরাধপ্রবণতার পেছনে রয়েছে নৈতিকতার অবক্ষয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো, তদারকির অভাব এবং অনৈতিক পরিবেশ। ইসলাম অনৈতিকতার উৎসগুলোকেই বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। কোরআনে এসেছে, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতার নিকটেও যেয়ো না।’ (সুরা আনআম: ১৫১) এবং ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৩২)

‘কাছেও যেয়ো না’—এই সতর্কবার্তার মূল তাৎপর্য হলো, অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে অপরাধের অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ বন্ধ করা বেশি জরুরি।

অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখতে হবে

যৌন নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের ঘটনা কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাব্যবস্থার একক সমস্যা নয়। সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মাদ্রাসা—নানা জায়গায় এ ধরনের অপরাধ ঘটতে দেখা যায়। তাই কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় তোলা যেমন অসংগত, তেমনি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার অজুহাতে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়াও চরম অন্যায়।

ন্যায্যবিচারের মূল কথা হলো—অপরাধীর পরিচয়, সামাজিক পদমর্যাদা বা ধর্মীয় পরিচয় যা-ই হোক না কেন, অপরাধীকে কেবল অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত করা, ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেবল ক্ষোভ প্রকাশ করে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা:

১. শিশুর সুরক্ষা নীতিমালা: প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে স্পষ্ট ও বাধ্যবাধকতামূলক নিরাপত্তা নীতিমালা থাকতে হবে, যাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই নিজেদের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকে।

২. একান্তে অবস্থান নিরুৎসাহিত করা: বন্ধ কক্ষ কিংবা নির্জন স্থানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর একা অবস্থান এড়িয়ে চলতে হবে। পরিবেশ দৃশ্যমান ও নিরাপদ হওয়া উচিত।

৩. নিয়োগে যাচাই-বাছাই: শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতাই নয়, তাঁদের পূর্ববর্তী আচরণ ও চারিত্রিক রেকর্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা আবশ্যক।

৪. আবাসিক ব্যবস্থায় তদারকি: হোস্টেল, বাথরুমের প্রবেশপথ, সিঁড়ি ও করিডরে আলো নিশ্চিত করা এবং তদারকি বাড়ানো দরকার, তবে তা যেন শিশুর গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন না করে।

৫. শিক্ষকদের সুস্থ পারিবারিক জীবন: আবাসিক শিক্ষকদের পর্যাপ্ত ছুটি ও যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তাঁদের মধ্যে কোনো মানসিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি না হয়।

৬. গোপন অভিযোগের ব্যবস্থা: শিক্ষার্থীরা যাতে ভয় বা লজ্জা ছাড়া অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য সহজ ও গোপনীয় অভিযোগ বাক্স বা ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠামাত্র প্রমাণ ছাড়া বিচার না করে নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ দিতে হবে।

৭. অপরাধে জিরো টলারেন্স: অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে।

৮. অভিভাবকদের সচেতনতা: সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ভয় বা কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখলে অভিভাবকদের শুরুতেই সচেতন হতে হবে।

শিশুর শৈশব একবার নষ্ট হয়ে গেলে অপরাধীর শাস্তি হলেও সেই ক্ষত পুরোপুরি পূরণ হয় না। অপরাধী কেবলই একজন অপরাধী—কওমি মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন, স্কুল বা কলেজ কোনো জায়গাই শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্র হতে পারে না। শিশুর জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা কোনো করুণা নয়; এটি পরিবারের আমানত এবং পুরো সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও, ঢাকা