পবিত্র কাবা শরিফ—গোটা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে আবেগ, অনুভূতি আর পরম পবিত্রতার এক নাম। মহান আল্লাহ তাআলার এই ঘরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় মুসলিম উম্মাহর ইবাদত-বন্দেগি। তবে কাবার বাইরের দৃশ্য সবার পরিচিত হলেও এর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ কেমন, ভেতরে কী কী রয়েছে—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।
একনজরে কাবার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো
কাবার দরজা বছরে মাত্র দুবার ধৌতকরণ ও বিশেষ রাষ্ট্রীয় মেহমানদের জন্য খোলা হয়। কাবার ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত আধ্যাত্মিক, শান্ত ও জাঁকজমকহীন আভিজাত্যে ঘেরা। এর উচ্চতা ১২ থেকে ১৩ মিটার।
- তিনটি স্তম্ভ: কাবার ছাদকে ধারণ করার জন্য সারিবদ্ধভাবে তিনটি মজবুত কাঠের স্তম্ভ রয়েছে। এগুলো আবদুল্লাহ বিন জুবায়ের (রা.)-এর সময় থেকে স্থাপিত এবং উন্নতমানের ‘টিক’ কাঠ দিয়ে নির্মিত। বর্তমানে স্তম্ভগুলোকে স্বর্ণখচিত ডিজাইনে সুসজ্জিত করা হয়েছে।
- মেঝে ও দেয়াল: কাবার মেঝে ও দেয়ালের নিচের অংশ সাদা ও ধূসর মার্বেল পাথরে আবৃত। দেয়ালের ওপরের অংশে সবুজ রেশমি কাপড় বা প্যানেল রয়েছে, যাতে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত স্বর্ণখচিত ক্যালিগ্রাফিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
- ছাদ: শুরুতে কাবার কোনো ছাদ ছিল না। কুরাইশদের সংস্কারের সময় প্রথম ছাদ দেওয়া হয় এবং পরে কাঠামো মজবুত করতে আরও একটি বাড়তি ছাদ যুক্ত করা হয়।
কাবার ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনসমূহ
কাবার ভেতরে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও বিশেষ বস্তু সংরক্ষিত রয়েছে:
- ১. বাবুত তাওবা: কাবার ভেতরে প্রবেশের পর ডান পাশে একটি ছোট সোনার দরজা রয়েছে, যার নাম ‘বাবুত তাওবা’ বা তাওবার দ্বার। এটি মূলত কাবার ছাদে ওঠার সিঁড়িঘর।
- ২. ঐতিহাসিক প্রদীপমালা: স্তম্ভগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন যুগের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বেশ কিছু মশাল, পিদিম ও প্রদীপমালা ঝোলানো রয়েছে। এগুলো বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের প্রভাবশালী রাজা-বাদশাহরা উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন।
- ৩. নবীজির (সা.) নামাজের স্থান: কাবার ভেতরে একটি বিশেষ জায়গা চিহ্নিত করা আছে, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর প্রবেশ করে নামাজ আদায় করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, কাবার ভেতরে যেকোনো দিকে মুখ করেই নামাজ পড়া যায়।
- ৪. সুগন্ধির বাক্স: ভেতরে একটি মার্বেল পাথরের তৈরি টেবিল বা বাক্সের মতো স্থান রয়েছে, যেখানে উন্নতমানের উদ, কস্তুরি ও গোলাপজলের মতো সুগন্ধি রাখা হয়।
- ৫. স্মারক ফলক: কাবার ভেতরের দেয়ালে বিভিন্ন যুগের খলিফা ও বাদশাহদের নামসংবলিত মার্বেল ফলক রয়েছে, যাঁরা বিভিন্ন সময়ে কাবার বড় ধরনের সংস্কারকাজ করেছিলেন।
কাবার দরজা ও গিলাফের মাহাত্ম্য
কাবার বর্তমান দরজাটি ১৯৭৭ সালে বাদশাহ খালিদ বিন আবদুল আজিজের নির্দেশে তৈরি। ১০ সেন্টিমিটার পুরুত্বের উন্নতমানের কাঠে নির্মিত এই দরজায় প্রায় ২৮০ কেজি খাঁটি সোনা ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কাবার বাইরের অংশ ঢাকা থাকে কালো রঙের গিলাফ বা ‘কিসওয়া’ দিয়ে। এটি তৈরিতে প্রায় ৬৭০ কেজি রেশম ও ১৫ কেজি সোনার সুতা প্রয়োজন হয়, যার ব্যয়ভার ৫০ কোটি টাকার বেশি।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম
পবিত্র কাবার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে জমজমের পানি, খাঁটি গোলাপজল ও বিশেষ ‘উদ’ সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়। খেজুর পাতা ও কোমল সাদা কাপড় দিয়ে অত্যন্ত যত্নসহকারে এর মেঝে ও দেয়াল পরিষ্কার করা হয়।
সব মিলিয়ে, পবিত্র কাবার ভেতরে কোনো আড়ম্বরপূর্ণ জৌলুশ নয়, বরং সরলতা ও আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্যে পূর্ণ। এটি এমন এক স্থান, যেখানে গেলে মহান রবের শ্রেষ্ঠত্ব ও ইসলামের সুপ্রাচীন ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে।