হোম > ইসলাম

রাষ্ট্র গঠনে মহানবী (সা.)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল

ইফতেখার মো. আব্দুর রহমান

নবুওয়াত পাওয়ার পর দীর্ঘ ১৩ বছর নিজ জন্মভূমি মক্কায় চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি তাওহিদ ও সাম্যের বিপ্লবাত্মক বাণী প্রথমে গোপনে এবং পরে প্রকাশ্যে প্রচার করেন। ফলস্বরূপ তৎকালীন মক্কার কুরাইশদের পৌত্তলিক ধর্মমত, অন্যায্য অর্থব্যবস্থা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যে প্রবল ধাক্কা লাগে। নিজেদের কায়েমি স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে কুরাইশরা মুসলমানদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার ও পীড়ন চালাতে শুরু করে। এমন এক সংকটাপন্ন মুহূর্তে মুসলিম উম্মাহর একটি নিজস্ব স্বাধীন ভূখণ্ডের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে ওঠে, যেখানে তারা নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন করতে পারবেন।

অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে শুরু হয় ঐতিহাসিক হিজরত। যে ইয়াসরিব ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামি রাষ্ট্র—মদিনা। কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই নন, একজন দক্ষ ও প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মহানবী (সা.) মদিনাকে কেন্দ্র করে যেভাবে এই রূপান্তর ঘটিয়েছিলেন, তা কালজয়ী ও বিস্ময়কর।

মদিনাকে রাষ্ট্র হিসেবে নির্বাচনের ভূ-রাজনৈতিক কারণ

একজন সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রনায়ক তাঁর ভাবি রাষ্ট্রের জন্য এমন এক অঞ্চল নির্বাচন করেন, যা প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মদিনা ছিল এসব দিক থেকে আদর্শ। এটি ছিল তৎকালীন আরবের অন্যতম উর্বর ও বাণিজ্যিক রুট। কুরাইশদের ইয়েমেন থেকে সিরিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার মূল পথ ছিল মদিনা ঘেঁষে। ফলে মদিনায় অবস্থান নেওয়া মানে কুরাইশদের অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখার মোক্ষম সুযোগ তৈরি করা।

দ্বিতীয়ত, মদিনা ছিল তৎকালীন আরবের এক আন্তর্জাতিক ও বহুমাত্রিক জনপদ। আসমানি গ্রন্থের ভাববাণী অনুসরণে আহলে কিতাব বিশেষত ইহুদিরা বহু পূর্ব থেকেই সেখানে বসতি গড়ে তুলেছিল। স্থানীয় পৌত্তলিক, খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের সহাবস্থান মদিনাকে বহু সংস্কৃতির কেন্দ্র বানিয়েছিল, যা পরে বিশ্বজুড়ে ইসলামের দাওয়াত বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া আরবের শুষ্ক ও কঠোর আবহাওয়ার তুলনায় মদিনার সবুজ-শ্যামল পরিবেশ সেখানকার অধিবাসীদের মেজাজকে করেছিল নম্র, দয়ালু ও সুবিবেচক। এই মনস্তাত্ত্বিক উপাদানও রাসুল (সা.)-এর হিজরতের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করে।

আকাবার শপথ ও বৈধ রাজনৈতিক ভিত্তি

নবুওয়াতের দশম বর্ষে আকাবায় ইয়াসরিব থেকে আসা ছয় ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক ভিত্তির বীজ রোপণ করা হয়। পরে আকাবার দ্বিতীয় ও তৃতীয় শপথের ঘটনা ঘটে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত মুসয়াব ইবনে উমাইর (রা.)-কে শিক্ষক হিসেবে মদিনায় পাঠান এবং মদিনাবাসীর মধ্য থেকে ১২ জন প্রতিনিধি (নাকিব) মনোনীত করেন। তাঁদের দাওয়াতি তৎপরতা মদিনায় নজিরবিহীন অনুকূল জনমত তৈরি করে। ফলে রাসুল (সা.) যখন মদিনায় পৌঁছান, তখন তিনি কেবল একজন ধর্মীয় গুরু নন, বরং বিপুল জনমতের সমর্থনে এক স্বীকৃত রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন।

মসজিদে নববি: ক্ষমতার সামাজিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র

মদিনায় পৌঁছেই রাসুল (সা.) প্রথম যে কাজটি করেন, তা হলো ‘মসজিদে নববি’র ভিত্তিস্থাপন। এটি কেবল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের স্থান ছিল না; বরং এটি ছিল নতুন রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা, কূটনৈতিক বৈঠক ও সামাজিক দিকনির্দেশনার প্রধান ভরকেন্দ্র। একটি উদীয়মান রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় ‘কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে কাজ করেছিল এই ঐতিহাসিক মসজিদ।

মুহাজির ও আনসারদের অনন্য সমন্বয়

হিজরতের পর অন্যতম বড় সামাজিক সংকট হিসেবে দেখা দেয় বাস্তুচ্যুত মুহাজিরদের পুনর্বাসন। ভিটেমাটি ও সম্পদ ত্যাগ করে আসা এই নিঃস্ব মানুষের আশ্রয় দিতে না পারলে নতুন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ত। রাসুল (সা.) কোনো সরকারি কর বা বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ইমানের ভিত্তিতে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ‘আখুওয়াত’ বা ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে দেন।

পবিত্র কোরআনে এই আত্মত্যাগের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা ইমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, আর যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সহায়তা করেছে—তারা একে অপরের পরম বন্ধু।’ (সুরা আনফাল: ৭২)

এই পদক্ষেপের সুফল ছিল দ্বিমুখী। প্রথমত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিমেষেই দূর হয়। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সময় রাসুল (সা.)-এর সান্নিধ্যে থাকা মুহাজির সাহাবিগণ আনসারদের ঘরে ঘরে থেকে তাঁদের সরাসরি ইসলামি জ্ঞানে পারদর্শী করে তোলেন। ফলে স্বল্প সময়ে একটি সুশিক্ষিত ও আদর্শিক প্রজন্ম গড়ে ওঠে।

দক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক মিত্রতা

অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি রাসুল (সা.) মদিনার সীমান্ত ও উপকণ্ঠে বসবাসকারী গোত্রগুলোর সঙ্গে পররাষ্ট্রনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন। তিনি নিজে বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চল সফর করে পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলোর সঙ্গে নন-অ্যাগ্রেশন বা শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। ফলে মদিনার চারপাশে এক শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়, যা নতুন রাষ্ট্রটিকে বাহ্যিক আক্রমণ থেকে মুক্ত রেখে দ্রুত অগ্রগতির পথে এগিয়ে নেয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।