হোম > ইসলাম

কাজা নামাজ আদায়ের নিয়ম ও সঠিক পদ্ধতি

ইসলাম ডেস্ক 

প্রতীকী ছবি

দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা, অবহেলা, ঘুম কিংবা ভুলেই—যে কারণেই হোক না কেন, নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ বা ওয়াজিব নামাজ আদায় করতে না পারলে পরবর্তী সময় তা আদায় করা ইসলামি শরিয়তে আবশ্যক। অতীতে কাজা হয়ে যাওয়া বহু ওয়াক্তের ফোটানো বা ছুটে যাওয়া নামাজ আদায় করার এই বিশেষ প্রয়াসকে ইসলামি পরিভাষায় ‘উমরি কাজা’ বলা হয়।

অনেকেই না জেনে উমরি কাজার পরিবর্তে নফল নামাজ পড়ার পরামর্শ দেন, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। কোরআন, হাদিস, সাহাবিদের আমল এবং চার মাজহাবের আলেমদের সর্বসম্মত ঐকমত্য (ইজমা) অনুযায়ী জিম্মায় থাকা কাজা নামাজ আদায় করা ফরজ।

কাজা নামাজ আদায় করা কেন আবশ্যক?

ফরজ বা ওয়াজিব নামাজ কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ে আদায় করা না গেলে তা চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় না; বরং স্মরণ হওয়া মাত্রই তা পূর্ণ করা আবশ্যক।

কোরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘নামাজ কায়েম করো আমার স্মরণের জন্য।’ (সুরা ত্ব-হা, আয়াত: ১৪)। মুফাসসিরগণের মতে, এ আয়াতের অর্থ হলো—নামাজ ছুটে গেলে স্মরণ হওয়া মাত্রই তা আদায় করে নিতে হবে।

হাদিসের নির্দেশ: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজের কথা ভুলে যায় কিংবা নামাজ না পড়ে ঘুমিয়ে থাকে, তার কাফফারা হলো—যখন নামাজের কথা স্মরণ হবে, তখনই তা আদায় করা।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৭৬, সহিহ মুসলিম: ৬৮৪)।

কোন কোন নামাজের কাজা করতে হয়?

শরিয়তের মূলনীতি অনুযায়ী সব ধরনের নামাজ কাজা করতে হয় না। নিচে ছকের মাধ্যমে তা তুলে ধরা হলো:

কাজা নামাজ নামাজের প্রকার কাজা আদায়ের বিধান বিস্তারিত ফরজ নামাজ আবশ্যক দৈনিক পাঁচ ওয়াক্তের মূল ফরজ নামাজ ছুটে গেলে তা অবশ্যই কাজা আদায় করতে হবে। ওয়াজিব নামাজ আবশ্যক এশার নামাজের পরের বিতর নামাজ ওয়াজিব, তাই তা ছুটে গেলে তা বশ্যই কাজা আদায় করতে হবে। সুন্নত ও নফল কাজা নেই সুন্নত বা নফল নামাজ সময়মতো পড়া না গেলে তা পরবর্তী সময় কাজা আদায় করতে হয় না।

মনে রাখার বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তি যদি কাজা নামাজ না পড়ে ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং মৃত্যুর পূর্বে ওয়ারিশদের ফিদইয়া দেওয়ার অসিয়ত করে যায়, তবে তার ওয়ারিশদের ওপর ওই কাজা নামাজের ফিদইয়া (বিনিময় মূল্য) দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়।

কাজা নামাজ আদায়ের সহজ ও সঠিক পদ্ধতি

যাদের জিম্মায় অনেক দিনের (বা কয়েক বছরের) কাজা নামাজ জমে আছে, তাদের দ্রুত তা আদায় শুরু করা উচিত। কাজা নামাজ আদায়ের নিয়ম হলো:

১. কাজা নামাজের নিয়ত

কাজা নামাজ আদায়ের সময় সুনির্দিষ্ট ওয়াক্ত ও দিনের নিয়ত করতে হয়।

নির্দিষ্ট দিন মনে থাকলে: ‘আমি অমুক দিনের জোহরের ফরজ নামাজ কাজা আদায়ের নিয়ত করছি।’

দিন-তারিখ মনে না থাকলে: ‘আমি আমার জিম্মায় থাকা জীবনের সর্বপ্রথম জোহর নামাজের কাজা আদায় করছি।’ এভাবে ধারাবাহিকভাবে আদায় করতে থাকবে, যতক্ষণ না মন সাক্ষ্য দেয় যে আর কোনো নামাজ কাজা নেই।

২. সহজ রুটিন তৈরি করা

কাজা আদায়ের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো প্রতিদিনের নির্ধারিত ফরজ নামাজের আগে বা পরে একটি বা একাধিক ওয়াক্তের কাজা আদায় করে নেওয়া। উদাহরণস্বরূপ: আজকের আসরের ফরজ পড়ার আগে অতীতে ছুটে যাওয়া একটি আসরের কাজা পড়া।

৩. নিষিদ্ধ সময় বর্জন করা

কাজা নামাজ দিন বা রাতের যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে শরিয়তে নিষিদ্ধ তিনটি সময়ে সব ধরনের নামাজ পড়া হারাম:

১. সূর্যোদয়ের মুহূর্ত।

২. ঠিক দুপুরে সূর্য মাথার ওপর থাকা অবস্থায়।

৩. সূর্যাস্তের সূচনালগ্ন।

৪. মুকিম ও মুসাফির অবস্থায় কাজা নামাজের বিধান

  • কাজা নামাজ আদায়ের সময় মূল নামাজের মতোই কেরাত ধীরগতিতে বা উচ্চ স্বরে পড়ার নিয়ম বজায় রাখতে হবে।
  • সফরের সময় চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজ কাজা হলে, বাড়িতে ফেরার পর তা কসর (২ রাকাত) হিসেবেই কাজা করতে হবে।
  • আবার মুকিম (বাড়িতে) অবস্থায় কাজা হওয়া চার রাকাত নামাজ সফরে গিয়ে আদায় করলে পুরো চার রাকাতই পড়তে হবে।

নফল নাকি কাজা কোনটি আগে পড়বেন?

যাদের জিম্মায় অতীতে বাতিল হওয়া ফরজ বা ওয়াজিব নামাজ রয়েছে, তাদের জন্য নফল নামাজের চেয়ে কাজা নামাজ আদায় করা অধিক উত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কেয়ামতের দিন প্রথম হিসাব নেওয়া হবে ফরজ নামাজের, নফল নামাজের নয়। কাজা আদায় শেষ হলে তখন পূর্ণ মনোযোগ নফল নামাজে দেওয়া যাবে।

কাজা নামাজ আদায়ে চার প্রধান মাজহাবের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামের চার প্রখ্যাত ইমাম ও মুজতাহিদগণ একমত যে—ফরজ নামাজ সময়মতো পড়া না হলে তা পরে হলেও আদায় করতেই হবে।

  • হানাফি মাজহাব: ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, জিম্মায় থাকা কাজা নামাজ আদায় করা ফরজ। (ফাতহুল কাদির)
  • শাফেয়ি মাজহাব: বাদ পড়া কাজা নামাজ অবিলম্বে আদায় করে ফেলা আবশ্যক। (আল-মাজমু)
  • মালিকি মাজহাব: কাজা নামাজ আদায় করা জরুরি, তবে সাধ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে আদায় করলেও চলবে।
  • হাম্বলি মাজহাব: ইচ্ছাকৃত নামাজ ছেড়ে দেওয়া মহাপাপ, কিন্তু তাওবা করে কাজা আদায় করাই বান্দার দায়িত্ব। (আল-মুগনি)

কাজা নামাজ আদায়ের বিধান হলো বান্দার প্রতি আল্লাহর অসীম রহমত ও ক্ষমার সুযোগ। অতীতে অবহেলা বা অজ্ঞতাবশত যত নামাজই ছুটে যাক না কেন, আজই তা আদায়ের দৃঢ় সংকল্প করা উচিত। প্রতিদিনের সাধারণ নামাজের সঙ্গে নিয়ম করে অতীতের কাজাগুলো আদায় করলে একসময় জিম্মা মুক্ত হওয়া সম্ভব। তাই হেলাফেলা না করে তওবার মাধ্যমে নিয়মিত উমরি কাজা শুরু করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য।