আপনার জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ কী? এ দিনটি পালনের নেপথ্যে প্রচলিত ইতিহাস ও এর ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাই।
খবিরুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ।
উত্তর: বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান, ইরান ও ইরাকের মতো কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের একাংশে প্রতিবছর সফর মাসের শেষ বুধবার ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ পালিত হতে দেখা যায়। ফারসি এই বাক্যটির আক্ষরিক অর্থ হলো—‘সফর মাসের শেষ বুধবার’ (ফারসি ‘আখেরি’ অর্থ শেষ, ‘চাহর’ অর্থ সফর মাস এবং ‘সোম্বা’ অর্থ বুধবার)। লোকমুখে ও কিছু অপ্রচলিত কিতাবে এ দিনটির বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণিত হলেও ইসলামি পণ্ডিত ও সিরাত গবেষকদের দৃষ্টিতে এর ভিত্তি নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
আখেরি চাহার সোম্বা পালনের নেপথ্যে মূলত দুটি লোকপ্রচলিত ধারণার কথা বলা হয়ে থাকে:
১. প্রচলিত কিতাব (যেমন, বারো চান্দের ফজিলত বা রাহাতুল কুলুব) অনুযায়ী, হিজরি ১১ সনের সফর মাসের শেষের দিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনসায়াহ্নে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সফর মাসের শেষ বুধবারে তিনি কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন, গোসল সমাপন করেন এবং মসজিদে নববিতে উপস্থিত হয়ে সাহাবিদের নিয়ে জোহরের নামাজ আদায় করেন।
২. জাদুর প্রভাব থেকে মুক্তি: অন্য একটি মতে, সপ্তম হিজরিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর জনৈক ইহুদির জাদুর যে প্রভাব পড়েছিল, তা সফর মাসের শেষ বুধবারে কেটে যায় এবং তিনি সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেন।
এই দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিচারণা হিসেবেই বিশ্বজুড়ে একশ্রেণির মুসলমান গোসল-অজু সম্পাদন, বিশেষ নফল নামাজ আদায়, দরুদ শরিফ পাঠ এবং দান-সদকার মাধ্যমে দিনটি পালন করে থাকেন। বাংলাদেশেও দিনটি উপলক্ষে সরকারি ঐচ্ছিক ছুটি বহাল রয়েছে।
প্রচলিত এই ধারণাসমূহকে ইসলামি পণ্ডিত, সিরাত গবেষক ও নির্ভরযোগ্য হাদিস বিশারদগণ ভিত্তিহীন ও প্রামাণ্য দলিলবিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের উপস্থাপিত ঐতিহাসিক যুক্তিগুলো নিম্নরূপ:
ক. অসুস্থতার দিনক্ষণ নিয়ে মতভেদ: প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামের বর্ণনানুযায়ী, মহানবী (সা.)-এর অন্তিম অসুস্থতা শুরু হয়েছিল ১৮ সফর অথবা রবিউল আউয়াল মাসের শুরুতে। তিনি ঠিক কোন দিন অসুস্থ হন (শনি, সোম নাকি বুধবার) এবং কত দিন অসুস্থ ছিলেন (১০, ১২, ১৩ নাকি ১৪ দিন), তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ফলে সফর মাসের শেষ বুধবারেই তিনি সুস্থ হয়ে গোসল করেছিলেন, এমন নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বিশুদ্ধ হাদিস সনদে পাওয়া যায় না।
খ. জাদুর ঘটনার সময়কাল: সিরাতগ্রন্থ ও হাদিসের (যেমন ফাতহুল বারি, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া) সনদ অনুযায়ী, হুদায়বিয়ার সন্ধির পর সপ্তম হিজরির মহররম মাসে নবীজি (সা.)-এর ওপর জাদুর প্রভাব ঘটেছিল, যা ৪০ দিন থেকে ৬ মাসের মধ্যে সমাপ্ত হয়। সুতরাং, সফর মাসের শেষ বুধবারে জাদুর প্রভাব কাটার দাবিটির পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
গ. সাহাবি ও তাবেয়িদের আমলে অনুপস্থিতি: বিশ্বনবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর খোলাফায়ে রাশেদিন বা সাহাবায়ে কেরাম কখনো এ দিনটি উৎসব বা ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালন করেননি।
উত্তর দিয়েছেন: মুফতি হাসান আরিফ, ইসলামবিষয়ক গবেষক