বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি ‘গুজব’ নামক এক বিষবৃক্ষ আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে করে তুলছে বিষাক্ত। না জেনে কোনো সংবাদ প্রচার করা বা কোনো ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া আজ যেন একটা কঠিন ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ইসলাম এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং মানুষকে দিয়েছে সত্যনিষ্ঠার এক চিরন্তন ফর্মুলা।
বিশ্বাস করার আগে চাই যাচাই
গুজব বা উড়ো খবর বলতে সাধারণত এমন অসত্য বা অর্ধসত্য তথ্যকে বোঝায়, যা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করে। কোনো সংবাদ শুনলেই তা অন্ধভাবে বিশ্বাস বা প্রচার করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এই বিষয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী নির্দেশনা দিয়েছেন। সুরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের কাছে যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করো, পাছে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধন করো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য নিজেদের লজ্জিত হতে হয়।’
না জেনে অনুসরণ করার পরিণাম
অনেক সময় আমরা ‘লোকে বলে’ কিংবা ‘শুনেছি’—এমন যুক্তিতে কোনো কথা ছড়িয়ে দিই। অথচ যে বিষয়ে আমাদের কাছে নিশ্চিত জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে কথা বলতে ইসলাম নিষেধ করেছে। সুরা বনি ইসরাইলের ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সাবধান করে দিয়েছেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এদের প্রতিটি সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ অর্থাৎ আমরা যা শুনি বা দেখি, তা সঠিক কি না, বিচার না করেই তা প্রচার করলে পরকালে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।
শোনা কথা প্রচারে সতর্কতা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস আজ আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য এক মহাসত্য হয়ে আছে। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে তা-ই (যাচাই না করে) প্রচার করে বেড়ায়।’ (সুনানে আবু দাউদ)। এর মানে হলো, আপনি সরাসরি মিথ্যা না বললেও যদি শোনা কথা যাচাই ছাড়া শেয়ার বা প্রচার করেন, তবে আপনিও ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যাবাদীদের কাতারেই শামিল হতে পারেন। নিজের অগোচরেই আপনি হয়তো এক বিশাল পাপে জড়িয়ে পড়ছেন।
উত্তরণের পথ: সচেতনতা ও নীরবতা
গুজব ও বিভ্রান্তি থেকে বাঁচার জন্য ইসলাম আমাদের দুটি কার্যকর হাতিয়ার দিয়েছে: ১. দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: সব সময় চোখ-কান খোলা রাখা এবং কোনো উত্তেজনাপূর্ণ সংবাদ এলে তার গোড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা। আবেগ দিয়ে নয়, বিবেক ও যুক্তি দিয়ে সংবাদকে বিচার করা। ২. নীরবতার শিক্ষা: অপ্রয়োজনীয় কথা বা যে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, সে বিষয়ে চুপ থাকা অনেক বড় ইবাদত। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নীরবতা অবলম্বন করে, সে বহু অন্যায় থেকে মুক্তি পায়।’ (জামে তিরমিজি)