মানুষের ব্যক্তিত্ব, চরিত্র ও আত্মিক মর্যাদার সর্বোত্তম বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর বাচনভঙ্গির মাধ্যমে। কথা বলার ধরন, শব্দচয়ন, বাক্যের অলংকার, স্বরের ওঠানামা এবং প্রকাশের তেজস্বিতাই বুঝিয়ে দেয় বক্তা ঠিক কোন মানের ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সর্বকাল ও সর্বজাতির মধ্যে বাচনিক প্রজ্ঞার সর্বময় গুণের অধিকারী। তিনি যেমন অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে দূরে থাকতেন, তেমনি সত্য ও ন্যায়ের স্থানগুলোতে কখনো নিশ্চুপ থাকতেন না। পরিমিতভাষিতা ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান ভূষণ। তাঁর মেজাজে যেমন ছিল গাম্ভীর্য, তেমনি ছিল সুন্নতি হাস্য-রস। এ জন্যই তাঁকে ‘জাওয়ামিউল কালিম’ বা অল্প কথায় গভীর অর্থবোধক বাক্য বলার ঐশী ক্ষমতায় ভূষিত করা হয়েছিল।
জায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমরা যখন দুনিয়াবি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম, নবীজি (সা.) তাতেও সানন্দে অংশ নিতেন। যখন আমরা আখিরাতের কথা বলতাম, তিনিও সেখানে দিকনির্দেশনা দিতেন। এমনকি আমরা খানাপিনা নিয়ে কথা বললেও তিনি তাতে যোগ দিতেন। তবে সর্বাবস্থায় তাঁর মেজাজ ও কথা ছিল সম্পূর্ণ সত্যে প্রতিষ্ঠিত।
তিনি শপথ করে বলতেন, তাঁর মুখ দিয়ে কখনো সত্য ও ন্যায়সংগত কথা ছাড়া কিছুই বের হয়নি। পবিত্র কোরআনেও স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দিয়েছেন, ‘তিনি (নবীজি) নিজ খেয়ালখুশি মতো মনগড়া কিছু বলেন না।’ (সুরা নাজম: ৩)
হুনাইনের যুদ্ধের পর গণিমতের মাল বণ্টনের সময় অমুসলিমদের কিছুটা বেশি দেওয়া হলে আনসার সাহাবিদের মনে মৃদু ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি অনুধাবন করে রাসুল (সা.) আনসারদের জন্য আলাদা একটি তাঁবু টাঙিয়ে তাঁদের একত্র করলেন এবং ভালোবাসামাখা বাকপটুতায় কথা বললেন।
তিনি বললেন, ‘হে আমার আনসার সাহাবিরা! মক্কা বিজয়ের পর নবমুসলিমরা না হয় উট, ভেড়া ও গবাদিপশু নিয়ে বাড়ি ফিরছে; কিন্তু তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, অন্যরা দুনিয়ার মাল নিয়ে ফিরলেও তোমরা আল্লাহর রাসুলকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের ঘরে ফিরছ?’
নবীজি (সা.)-এর মুখ নিঃসৃত এই একটি বাক্য মুহূর্তেই আনসার সাহাবিদের হৃদয় স্পর্শ করল। পুরো কাফেলায় কান্নার রোল বয়ে গেল। তাঁরা সমস্বরে কেঁদে উঠে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা আপনার এই সিদ্ধান্তের ওপর শতভাগ সন্তুষ্ট।’
কথা বলার সময় রাসুল (সা.) প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত স্পষ্ট ও ধীরস্থিরভাবে উচ্চারণ করতেন; শ্রোতারা চাইলে তা গুনে রাখতে পারত। হিজরতের ঐতিহাসিক সফরে উম্মে মাবাদ (রা.)-এর তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়ার পর নবীজি (সা.)-এর সুমিষ্ট বাকরীতির প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন, ‘তাঁর কথা যেন মুক্তার ঝরে পড়া সুবিন্যস্ত মালা!’
বস্তুত তিনি ছিলেন সমগ্র আরবের সবচেয়ে সুভাষী মানুষ। তাঁর ভাষার সাহিত্যিক মান যেমন ছিল সর্বোচ্চ, তেমনি তা ছিল সরল ও সহজবোধ্য। তিনি কখনো গালিগালাজ, কুৎসিত বা নীচুমানের শব্দ ব্যবহার করেননি। উপরন্তু, দ্বীনের দাওয়াত ও যুগের প্রয়োজনে তিনি এক স্বকীয় ভাষা ও শৈলী উদ্ভাবন করেছিলেন। তাঁর কালজয়ী উক্তি—‘যুদ্ধ একটি কৌশল’—এর ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, এটি ছিল নবীজি (সা.)-এর বিশেষ আলংকারিক ভাষা। তিনি এমন বহু পরিভাষা, বাগধারা ও উপমার প্রবর্তন করেছেন।
একবার বনু নাহদ গোত্রের কয়েকজন লোক রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে দীর্ঘ সংলাপ শেষে বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা একই মায়ের সন্তান, একই আবহাওয়ায় বেড়ে উঠেছি; অথচ আপনি যে চমৎকার ভঙ্গিতে কথা বলেন, এর গভীরতা আমরা অনেকেই ঠাওর করতে পারি না!’ নবীজি (সা.) মৃদু হেসে জবাব দিলেন, ‘আল্লাহ তাআলা স্বয়ং আমাকে ভাষা ও সাহিত্য শিখিয়েছেন, তাই সর্বোত্তমটাই শিখিয়েছেন। তা ছাড়াও আমার শৈশব কেটেছে আরবি ভাষার বিশুদ্ধতম কেন্দ্র বনু সাদ গোত্রে।’
তিনি অহেতুক দীর্ঘ ভাষণ কিংবা ঘন ঘন বক্তৃতা দিতেন না। সমাজের প্রয়োজন ও সার্বিক পরিবেশ বিবেচনা করে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য রাখতেন। মসজিদে খুতবা দেওয়ার সময় তিনি লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতেন, আবার যুদ্ধের ময়দানে বাহনের পিঠে বসেই ভাষণ দিতেন। কথাকে আরও দৃঢ় ও গুরুত্বপূর্ণ করতে কখনো কখনো তিনি বলতেন—‘যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, সেই সত্তার শপথ!’
ইসলামের মহান বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বাকপটুতা ও সুন্দর বাচনভঙ্গির গুরুত্ব অপরিসীম। সুমিষ্ট ও মার্জিত বাচনভঙ্গি মানুষকে কাছে টানে, আর রুক্ষ বাকরীতি মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। কথা বলার ধরন, শব্দচয়ন ও শালীনতা ঠিক কেমন হওয়া উচিত—তাঁর কালজয়ী ও পূর্ণাঙ্গ সুন্নাহ নিহিত রয়েছে বিশ্বনবী (সা.)-এর এই সুমহান জীবনচরিতে।
লেখক: আব্দুল্লাহ আল মুবাশ্বির, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।