স্রষ্টার এক অপূর্ব সৃষ্টি এই সুবিশাল মহাবিশ্ব। আর সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.)। তিনি নির্দিষ্ট কোনো গোত্র, ভূখণ্ড বা সময়ের সীমারেখায় আবদ্ধ হয়ে আসেননি; বরং ধরণির বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত ও শুভ বার্তা নিয়ে। মানবজাতি যখন হিংসা, অজ্ঞতা, বর্বরতা ও চরম অমানবিকতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই তিনি বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ন্যায়, সাম্য, দয়া ও সহমর্মিতার এক অনন্য কালজয়ী আদর্শ।
‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ শব্দের অর্থ সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য করুণা ও অনুকম্পার আধার। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই দয়ার পরিধি কেবল মুসলিম বা মানবজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিটি জীব ও প্রকৃতির কোণে কোণে। তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন, ‘আমি তো প্রেরিত হয়েছি পরম রহমত হিসেবে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৯৯)। সুতরাং, এই উপাধি কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক নাম নয়; এটি তাঁর অনন্য চরিত্র, সুমহান দাওয়াত, অনবদ্য সামাজিক সংস্কার, বিশ্বজনীন নেতৃত্ব ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি গভীর মমত্বের চিরন্তন প্রতিচ্ছবি।
রাসুল (সা.)-এর পবিত্র জীবন ছিল ক্ষমা ও উদারতার অনন্য রূপকথা। যারা তাঁকে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কখনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেননি; বরং বেছে নিয়েছেন হিদায়েত ও পরম করুণার পথ।
তায়েফের রক্তঝরা প্রান্তরে নির্মম পাথরের আঘাতে শরীর রক্তাক্ত হওয়ার পরও তিনি অভিশাপ দেননি। পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা তায়েফবাসীকে দুই পাহাড়ের মাঝে পিষে ধ্বংস করে দেওয়ার অনুমতি চাইলেও মহানবী (সা.) অসীম ধৈর্যে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি মমতাভরা কণ্ঠে আশা প্রকাশ করে বলেছিলেন—তাদের অনাগত বংশধরদের মধ্য থেকে অন্তত এমন মানুষ আসবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে (সহিহ বুখারি: ৩২৩১; সহিহ মুসলিম: ১৭৯৫)
একইভাবে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের দিন পরম ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তিনি দীর্ঘদিনের রক্তপিপাসু শত্রুদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। এমনকি কায়েমি স্বার্থবাদীদের সুদীর্ঘ অন্যায়ের জবাবে তিনি হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সুরেই বলেছিলেন—‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’
এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও তিনি বজায় রেখেছিলেন মানবিকতার সুকঠিন সীমা। যুদ্ধক্ষেত্রে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, নিরপরাধ নাগরিক হত্যা এবং গাছপালা কাটা বা উপাসনালয়ে রত ধর্মযাজকদের ওপর আক্রমণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ‘হুদাইবিয়ার সন্ধি’ বা ‘মদিনা সনদ’-এর ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির প্রতি তাঁর সুদৃঢ় নিষ্ঠা প্রমাণ করে—সামাজিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তিই হলো ন্যায়সংগত আচরণ ও পারস্পরিক বিশ্বাস।
রাসুল (সা.)-এর আগমনের আগে আরবের সমাজব্যবস্থা ছিল চরম বৈষম্যমূলক। তিনি আরবের সেই জাহেলি যুগের বর্ণবাদ, সামাজিক অভিজাত্য ও বংশীয় অহংকার চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেন। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেছিলেন—‘কোনো আরবের ওপর অনারবের, কিংবা কোনো অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; সাদা মানুষের ওপর কালো মানুষের, কিংবা কালো মানুষের ওপর সাদা মানুষের কোনো প্রাধান্য নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা পরহেজগারি।’
তিনি ক্রীতদাসদের মুক্তি দেওয়াকে অশেষ সওয়াবের কাজ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং দাসদের মনিবদের মতোই একই খাদ্য ও পোশাক দেওয়ার নির্দেশ দেন। একজন কৃষ্ণাঙ্গ প্রাক্তন ক্রীতদাস হজরত বিলাল (রা.)-কে বায়তুল্লাহর ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আজান দেওয়ার সুউচ্চ সম্মান দান করে তিনি বর্ণবাদমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের এক ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেছিলেন।
জাহেলি আরবের নিষ্পেষিত নারী, শিশু, এতিম ও শ্রমজীবী মানুষের পূর্ণ অধিকার ও সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছিলেন নবীজি (সা.)। এতিম প্রতিপালনকারীকে জান্নাতে নিজের পাশাপাশি অবস্থানের সুসংবাদ দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি ও এতিমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব’—এ কথা বলে তিনি শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল মিলিয়ে দেখান (সহিহ বুখারি: ৬০০৫)। তিনি শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।
পাশাপাশি, পশুপাখি ও পরিবেশের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর ব্যাকুলতা। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ‘জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তবেই আসমানের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (জামে তিরমিজি: ১৯২৪)
তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক পাপী নারীর ক্ষমা লাভ কিংবা বিড়ালকে অনাহারে রেখে শাস্তি পাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করে তিনি সৃষ্টির প্রতি অনুকম্পার গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন। এমনকি পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রেও ছুরি ধারালো করে পশুর কষ্ট কমানোর নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। অপ্রয়োজনে বৃক্ষনিধন করে পরিবেশ সুরক্ষার প্রথম কালজয়ী বার্তা তিনিই দিয়েছিলেন।
উম্মতের মুক্তি ও সার্বিক কল্যাণের জন্য রাসুল (সা.)-এর অন্তর সর্বদা ব্যথিত ও আকুল থাকত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে বড়ই পীড়াদায়ক। তিনি তোমাদের পরম কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি অতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।’ (সুরা তওবা: ১২৮)।
আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত, হিংসা ও বৈষম্যপীড়িত পৃথিবীতে রাসুল (সা.)-এর এই কালজয়ী উদারতা, ক্ষমা, ইনসাফ ও সাম্যের শিক্ষা অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়