হোম > ইসলাম

কালো জাদু কী? ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে

তাসনিফ আবীদ

ইসলামে কালো জাদু শেখা, করা বা এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা হারাম ও কুফরি। ছবি: সংগৃহীত

মানুষকে বিভ্রান্ত ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য শয়তানের অন্যতম মারাত্মক অস্ত্র হলো ‘কালো জাদু’ বা ‘সিহর’। বর্তমান ও অতীতে পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতেই এর উপস্থিতি দেখা গেলেও ইসলামি শরিয়াহর দৃষ্টিতে এর অবস্থান, পরিণতি ও বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর।

কালো জাদু কী?

আরবি ভাষায় জাদুকে বলা হয় ‘সিহর’ (السحر)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ হলো—কোনো কিছুকে তার বাস্তব রূপ থেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা, প্রতারণা, মন্ত্রমুগ্ধতা বা অলৌকিক উপায়ে কারও ওপর প্রভাব বিস্তার করা।

ইসলামি বিশ্বাস ও বিশেষজ্ঞদের সংজ্ঞানুযায়ী, কালো জাদু হলো এমন এক ধরনের অনৈতিক চর্চা, যার মাধ্যমে অপশক্তি, শয়তান বা দুষ্ট জিনদের সাহায্য নিয়ে বা তাদের সন্তুষ্ট করে অন্য কোনো মানুষের ক্ষতিসাধন করা হয়—যেমন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো, কাউকে অসুস্থ করা, মানসিক ভারসাম্যহীন করা কিংবা কারও মধ্যে কুপ্রভাব বিস্তার করা।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে জাদুর বাস্তবতা

ইসলামি আকাইদের মূলনীতি হলো—কালো জাদু বাস্তব জীবনে মানুষের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে।

১. পবিত্র কোরআনের প্রমাণ:

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, জাদুর শিক্ষা শয়তানদের কাজ:

‘সুলাইমান কুফরি করেননি, কুফরি তো করেছিল শয়তানরাই। তারা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত...।’

—(সুরা বাকারা: ১০২)

একই আয়াতে বাবিল শহরে ‘হারুত’ ও ‘মারুত’ নামক দুজন ফেরেশতার পরীক্ষার মাধ্যম হিসেবে জাদু শিক্ষার ঘটনার বিবরণ রয়েছে। তবে কোরআন স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে—আল্লাহর অনুমতি বা নির্দেশ ছাড়া জাদুকররা কারও বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারে না।

২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর জাদুর প্রভাব:

সহিহ হাদিস ও সিরাতের বর্ণনায় এসেছে, এক ইহুদি চক্রান্তের অংশ হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপরও কুফরি জাদুর প্রভাব তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে তা নস্যাৎ করা হয়। এটি প্রমাণ করে যে, জাদুর প্রভাবে মানুষ অসুস্থ হতে পারে, যা কাটাতে আল্লাহর সাহায্য ও মাসনুন ঝাড়ফুঁকের প্রয়োজন হয়।

ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী কালো জাদুর হুকুম

ইসলামে কালো জাদু শেখা, করা বা এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও কুফরি।

ইমানভঙ্গ ও কবিরা গুনাহ:

কালো জাদু করার মাধ্যমে মানুষ ইমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) যে সাতটি সর্বনাশা ও ধ্বংসাত্মক পাপের কথা বলেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো জাদু করা।

তওবার বিধান:

কোনো জাদুকর যদি লজ্জিত হয়ে খাঁটি মনে (খালেস দিলে) আল্লাহর কাছে তওবা করে এবং ভবিষ্যতে আর কখনো জাদু না করার অঙ্গীকার করে, তবে আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমা করতে পারেন। তবে জাদুর দ্বারা যদি পূর্বে অন্য কোনো মানুষের হক নষ্ট বা ক্ষতি করা হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া আবশ্যক।

জাদুকরের কঠোর শাস্তির বিধান

ইসলামি আইন ও বিচারব্যবস্থায় জাদুকরের জন্য অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে:

  • ১. আইনি শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ: জাদুর মাধ্যমে কারও ক্ষতি হলে এবং বিচারালয়ে তা প্রমাণিত হলে ইসলামি বিচারক বা আদালত নির্ধারিত দণ্ড প্রদান করবেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেবেন।
  • ২. মৃত্যুদণ্ড বা কিসাস: অধিকাংশ ফকিহ ও সাহাবিদের মতে—কালো জাদুকর তওবা না করলে এবং অপকর্ম চালিয়ে গেলে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা ইসলামি রাষ্ট্র ও আদালতের একটি অপরিহার্য বিধান। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘জাদুকরের শাস্তি হলো তরবারির আঘাতে মৃত্যুদণ্ড।’ (জামে তিরমিজি)

বৈধ চিকিৎসা: ‘রুকইয়াহ শরইয়াহ’ ও কোরআনিক আমল

ইসলাম অবৈধ ও কুফরি জাদুকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করলেও কোরআন ও দোয়ার মাধ্যমে সুস্থতা লাভ ও ঝাড়ফুঁককে (রুকইয়াহ) অনুমোদন ও উৎসাহিত করেছে।

বৈধ রুকইয়াহর ৪টি শর্ত:

  1. এতে কোনো প্রকার শিরক বা কুফরির সংমিশ্রণ থাকা যাবে না।
  2. বিশ্বাস রাখতে হবে যে, রুকইয়াহর নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই; শিফা বা আরোগ্য দেওয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ।
  3. দোয়াগুলো স্পষ্ট আরবি বা বোধগম্য ভাষায় হতে হবে।
  4. জিন বা শয়তানের সাহায্য নেওয়া যাবে না।

কালো জাদু হলো শয়তানি অপশক্তির কুফরি মাধ্যম, যা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এক আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখা, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা এবং সুন্নাহসম্মত মাসনুন দোয়া ও কোরআনিক রুকইয়াহর চর্চাই কালো জাদু থেকে বাঁচার একমাত্র নিরাপদ মাধ্যম।