বিদায় হজ সেরে মদিনায় ফেরার পর থেকেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র কথা ও আচরণে এক বিদায়ী সুর ফুটে উঠছিল। শরিয়তের পূর্ণতায় বিধান নাজিল হলো, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম।’ (সুরা মায়িদা: ৩)। গভীর প্রজ্ঞাসম্পন্ন সাহাবিগণ মহানবী (সা.)-এর পরম বন্ধুর সান্নিধ্যে যাওয়ার এক অদৃশ্য সংকেত টের পেয়েছিলেন। বিদায়ের সেই করুণ ঘনঘটা ঘনীভূত হতে হতে নেমে আসে একাদশ হিজরির সফরের শেষভাগে।
একাদশ হিজরির ২৮ সফর (সোমবার) রাসুলুল্লাহ (সা.) উহুদের প্রান্তরে গিয়ে শহীদদের জন্য এমন আকুল প্রার্থনা করেন, যেন দূর ভ্রমণের আগে প্রিয়জনদের শেষ বিদায় জানাচ্ছেন। মসজিদে ফিরে মিম্বরে দাঁড়িয়ে সাহাবিদের বললেন, ‘কাউসারের কিনারে আবার তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে।’
পরদিন ২৯ সফর মধ্য রাতে তিনি সেবক আবু মুওয়াইবাহ (রা.)-কে নিয়ে মদিনার ঐতিহাসিক কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’তে যান এবং সমাহিত মুমিনদের জন্য ক্ষমার দোয়া করেন। সেখান থেকে ঘরে ফেরার পরপরই তাঁর তীব্র মাথাব্যথা ও প্রচণ্ড জ্বর শুরু হয়। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) মাথার যন্ত্রণার কথা বললে পরম মমতায় নবীজি (সা.) জানালেন, তাঁর কষ্ট আরও বহুগুণ বেশি।
শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও ইসলামের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাসুল (সা.) রোমানদের বিরুদ্ধে উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। ১ রবিউল আউয়াল নিজ হাতে উসামার হাতে পতাকা তুলে দিয়ে জুরফ এলাকায় শিবির স্থাপনের নির্দেশ দেন। যদিও প্রবীণ সাহাবিদের সেনাদলে তরুণ উসামার নেতৃত্ব এবং রাসুল (সা.)-এর শারীরিক অবস্থার অবনতিতে যাত্রা কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছিল।
অসুস্থতার তীব্রতা বাড়লে নবীজি (সা.) ক্ষণে ক্ষণে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আগামীকাল আমি কোথায় থাকব?’ পতিপ্রাণা সহধর্মিণীগণ প্রিয় নবীর মনের ইচ্ছা বুঝতে পেরে পরম সানন্দে তাঁকে আয়েশা (রা.)-এর ঘরে থাকার সম্মতি দেন। ফজল ইবনে আব্বাস ও হজরত আলী (রা.)-এর কাঁধে ভর দিয়ে, পবিত্র চরণযুগল মাটিতে হিঁচড়ে যাওয়া অবস্থায় তিনি প্রিয়তমা আয়েশার হুজরায় স্থানান্তরিত হন। সেখানেই জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত হয়। আয়েশা (রা.) সুরা নাস, ফালাক ও অন্যান্য মাসনুন দোয়া পড়ে প্রিয় রাসুলকে ঝাড়ফুঁক করতেন।
ইন্তেকালের পাঁচ দিন আগে (বুধবার) শরীরে সাত মশক ঠান্ডা পানি ঢালার পর কিছুটা সুস্থতা বোধ করলে তিনি মাথায় পট্টি বেঁধে মসজিদে নববির মিম্বরে যান। সমবেত সাহাবিদের উদ্দেশ্যে এক আবেগময় শেষ ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘যদি আমি কারও পিঠে আঘাত করে থাকি, তবে এসে আমার পিঠে আঘাত করে প্রতিশোধ নাও। যদি কাউকে অপমান করে থাকি, তবে সে এসে আমাকে অপমান করো। পাওনা থাকলে চেয়ে নাও।’
এ সময় এক সাহাবি তিন দিরহাম পাওনা দাবি করলে তিনি তা তৎক্ষণাৎ পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। এরপর আনসারদের প্রতি বিশেষ ওসিয়ত করে বলেন, ‘আনসাররা আমার অন্তর ও কলিজা। মানুষ বাড়বে, কিন্তু আনসারদের সংখ্যা কমতে থাকবে। তোমরা তাদের সৎকাজগুলোকে গ্রহণ করবে এবং ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেবে।’ তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেন, ‘ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মতো তোমরা আমার কবরকে উপাসনার স্থান বা মূর্তিতে পরিণত কোরো না।’
ওফাতের চার দিন আগে (বৃহস্পতিবার) শারীরিক দুর্বলতা চরম আকার ধারণ করলে নবীজি (সা.) বেহুঁশ হয়ে পড়েন। চেতনা ফিরে পাওয়ার পর তিনি আবু বকর (রা.)-কে নামাজের ইমামতি করার নির্দেশ দেন। রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় হজরত আবু বকর (রা.) মোট ১৭ ওয়াক্ত নামাজে ইমামতি করেন।
এ সময় নবীজি (সা.) উম্মতের উদ্দেশ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দান করেন: ১. জাজিরাতুল আরব থেকে অমুসলিমদের অপসারিত রাখা। ২. আগত প্রতিনিধিদল ও অতিথিদের সম্মানিত করা। ৩. নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং অধীনদের (দাস-দাসী ও দুর্বলদের) অধিকার সুরক্ষা করা।
মৃত্যুর এক দিন আগে (রোববার) তিনি তাঁর কাছে থাকা সাতটি দিনার সদকা করে দেন, দাসদের মুক্ত করে দেন এবং নিজের ব্যবহৃত অস্ত্রসমূহ মুসলমানদের হিবা করে দেন। ওই রাতে চেরাগ জ্বালানোর মতো তেল না থাকায় আয়েশা (রা.) প্রতিবেশীর কাছ থেকে তেল ধার করে আনেন।
১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল (সোমবার) ফজরের নামাজের সময় আয়েশা (রা.)-এর ঘরের পর্দা সামান্য সরিয়ে নামাজরত সাহাবিদের কাতারবদ্ধ আবহে তাকিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃদু হাসেন। সাহাবিরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে ভেবেছিলেন নবীজি (সা.) হয়তো সুস্থ হয়ে গেছেন, কিন্তু তিনি হাসিমুখে হাত ইশারায় তাঁদের নামাজ সম্পন্ন করতে বলেন। এটিই ছিল সাহাবিদের চোখে তাঁর শেষ আলোকদ্যুতি।
দিনের আলো ফুটলে চাশতের সময় কন্যা ফাতেমা (রা.)-কে কাছে ডেকে কানে কানে দুটি কথা বলেন। প্রথমবার ফাতেমা কেঁদে ফেলেন এবং দ্বিতীয়বার হেসে ওঠেন। পরে ফাতেমা (রা.) জানান, প্রথমবার নবীজি (সা.) তাঁর বিদায়ের কথা বলেছিলেন এবং দ্বিতীয়বার সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে পরিজনের মধ্যে ফাতেমাই প্রথম তাঁর সঙ্গে জান্নাতে মিলিত হবেন।
জীবনের শেষ মুহূর্তে রাসুল (সা.) প্রিয়তমা আয়েশা (রা.)-এর বুকে হেলান দেন। আয়েশা (রা.)-এর ভাই আবদুর রহমানের কাছ থেকে নেওয়া মেসওয়াকটি নরম করে দিলে তিনি পরম তৃপ্তিতে তা ব্যবহার করেন। এরপর তাঁর পবিত্র চোখ দুটি আসমানের দিকে স্থির হয়ে যায়।
এরই সঙ্গে চিরতরে শান্ত হয়ে যায় সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ মানব, রহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ধরণির স্পন্দন। আয়েশা (রা.)-এর সেই পবিত্র প্রকোষ্ঠেই তাঁকে কাফন পরিয়ে দাফন করা হয়।