আপনার জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ কী? এ দিনটি পালনের নেপথ্যে প্রচলিত ইতিহাস ও এর ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাই।
আসলাম মিয়া, কুমিল্লা।
উত্তর: ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ, প্রখ্যাত আলেম ও কাদেরিয়া সুফি ধারার প্রতিষ্ঠাতা বড়পীর আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওফাত দিবস স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানই হলো ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’। সুফি অনুসারীদের কাছে এ দিনটি অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও শ্রদ্ধার সঙ্গে উদ্যাপিত হয়।
ফারসি ভাষার ‘ফাতিহা’ শব্দের অর্থ দোয়া, মোনাজাত বা মৃত ব্যক্তির রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে করা জিয়ারত বা তিলাওয়াত। আর ‘ইয়াজদহম’ ফারসি সংখ্যাবাচক শব্দ, যার অর্থ ‘এগারো’। হিজরি রবিউস সানি (বা রবিউল আখির) মাসের ১১তম দিনে আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) পরলোক গমন করেন। তাই ১১তম দিনের বিশেষ ইসালে সওয়াব ও মোনাজাতের এ অনুষ্ঠানকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদহম’ বলা হয়।
আবদুল কাদির জিলানি ৪৭০ হিজরিতে (১০৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) ইরানের জিলান প্রদেশের কাস্পিয়ান সমুদ্র উপকূলবর্তী শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃসূত্রে তিনি হাসান (রা.) এবং মাতৃসূত্রে হোসাইন (রা.)-এর বংশধর। শৈশবেই জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে বাগদাদে গমন করেন। শায়খ আবু জাকারিয়া তাবরিজি (রহ.)-সহ তৎকালীন বিখ্যাত আলেমদের কাছে তফসির, হাদিস, ফিকহ ও আরবি সাহিত্যে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
তিনি কেবল সুফিসাধকই ছিলেন না; একই সঙ্গে ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন ও কাব্যে অগাধ পণ্ডিত এবং হাম্বলি ও শাফেয়ি মাজহাবের শীর্ষ ফকিহ ছিলেন।
বাগদাদে আবদুল কাদির জিলানির বয়ান ও নসিহত শোনার জন্য হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো। তাঁর মোহাচ্ছন্ন কণ্ঠ ও সুফি দর্শনে হাজার হাজার অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পথভ্রষ্ট মানুষ হিদায়েতের আলো খুঁজে পান। সুলতান নুরুদ্দিন জেনকি ও গাজি সালাহউদ্দিন আইয়ুবির বিশেষ কয়েকজন উপদেষ্টাও সরাসরি তাঁর দরসের ছাত্র ছিলেন।
কাদেরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাসাউফের সুমহান পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সুফি ধারায় পরম আধ্যাত্মিক মর্যাদার কারণে তিনি ‘গাউসুল আজম’ বা ‘বড়পীর’ হিসেবে সমধিক পরিচিত লাভ করেন। তাঁর লিখিত কালজয়ী গ্রন্থ ‘গুনিয়াতুত তালিবিন’, ‘ফাতহুল গাইব’, ‘আল-ফাতহুর রাব্বানি’ ও ‘কাসিদায়ে গাউসিয়া’ ইসলামি সাহিত্যে অমর স্থান দখল করে আছে।
হিজরি ৫৬১ সনের ১১ রবিউস সানি মোতাবেক ১১৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি মহান এই আলেম ও সুফি সাধক ইরাকের বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। সেখানেই তাঁর মাজার শরিফ অবস্থিত।
এ দিনটিতে আবদুল কাদির জিলানির জীবন, চরিত্র ও দ্বীনি খেদমত আলোচনা করা হয়। দরুদ পাঠ, দান-সদকা ও কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে তাঁর আত্মার মাগফিরাত ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ইসালে সওয়াব করা হয়।
ওলামায়ে কেরামের মতে, দিবসটিকে কেন্দ্র করে আলোকসজ্জা বা অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতায় মেতে ওঠার ইসলামি অনুমোদন নেই। কোনো স্থানকে সাজানো বা অনুষ্ঠানসর্বস্ব নয়; বরং তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ জীবন ও সুন্নাহ অনুসরণের শিক্ষা গ্রহণ করাই এ দিনের মূল উদ্দেশ্য।
আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ছিলেন সত্য ও আমানতদারিতার এক উজ্জ্বল বাতিঘর। ফাতিহা-ই-ইয়াজদহমের প্রকৃত শিক্ষা হলো তাঁর মতো চারিত্রিক মাধুর্য, সত্যবাদিতা ও সুন্নাহর প্রতি পূর্ণ অনুগত থেকে জীবন পরিচালনা করা।
উত্তর দিয়েছেন: মুফতি হাসান আরিফ, ইসলামবিষয়ক গবেষক