হোম > ইসলাম

নবীজি (সা.)-এর আগমনে সুবাসিত রবিউল আউয়াল

কাউসার লাবীব

হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাসের নাম রবিউল আউয়াল। আরবি ভাষায় রবি শব্দের অর্থ বসন্তকাল এবং আউয়াল অর্থ প্রথম; অর্থাৎ রবিউল আউয়াল মানে হলো প্রথম বসন্ত বা বসন্তকালের সূচনা। ঋতুচক্রে প্রকৃতি যেমন শুষ্কতার খোলস ভেঙে বসন্তের ছোঁয়ায় ফুলে-ফলে সুবাসিত ও সজীব হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনই চৌদ্দ শ বছর আগে অজ্ঞতা, জুলুম ও জাহেলিয়াতের মরুময় প্রান্তরে মানবতার পরম মুক্তির বার্তা নিয়ে আগমন করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাই তো এই পবিত্র মাস মুমিনের মানসে পরম শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সুবাসিত আবেগের এক চিরন্তন ঝরনাধারা।

অন্ধকার ধরায় আলোর মশাল

আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ শ বছর আগে মরুর আরব যখন ডুবন্ত ছিল জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে, মানবতা যখন পরাজিত হচ্ছিল পাশবিকতার কাছে—তখন মহান আল্লাহ তাআলা বিশ্বজগতের জন্য রাহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে তাঁর প্রিয়তম রাসুলকে দুনিয়ায় পাঠান। পবিত্র কোরআনে মহান রব ঘোষণা করেন, ‘হে নবী, আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত ও করুণাস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)

বিশুদ্ধ ইতিহাস ও সিরাতগ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, তৎকালীন বিখ্যাত ‘হস্তী বাহিনীর’ ঘটনার বছর ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে রবিউল আউয়াল মাসের এক সোমবার উষালগ্নে মহানবী (সা.) এই ধরায় তাশরিফ আনেন। আবু কাতাদা আনসারি (রা.) বর্ণিত সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রতি সোমবার রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছে।’

নবীজি (সা.)-এর জন্মের সময় ধাত্রী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর মা শিফা বিনতে আমর। জন্মের পর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে স্নেহের চাদরে জড়িয়ে কাবাঘরে নিয়ে যান এবং মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’। শৈশবে তিনি উম্মে আইমান বারাকা (রা.)-এর স্নেহছায়ায় প্রতিপালিত হন।

রবিউল আউয়াল: সিরাতের বহুমাত্রিক স্মৃতি

রবিউল আউয়াল কেবল নবীজি (সা.)-এর আগমনের মাসই নয়, বরং বিশ্বনবীর জীবনের বহু ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এই মাসের সঙ্গে:

ক. মক্কাবাসীর চরম নির্যাতন ও জুলুমের মুখে আল্লাহর নির্দেশে নবুয়াতের চতুর্দশ বর্ষের ১ রবিউল আউয়াল তিনি প্রিয় সঙ্গী আবু বকর (রা.)-কে নিয়ে মদিনার পথে হিজরত শুরু করেন এবং ৮ মতান্তরে ১২ রবিউল আউয়াল মদিনায় পৌঁছান। এ ছাড়া হিজরতের পথে এই রবিউল আউয়াল মাসেই প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর ‘মসজিদে কুবা’ এবং পরবর্তীকালে ‘মসজিদে নববি’।

খ. হিজরি প্রথম সনের রবিউল আউয়ালে নবীজি (সা.) তাঁর কন্যা উম্মে কুলসুম (রা.)-কে উসমান (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ে দেন। এ ছাড়া দ্বীনের নিরাপত্তা ও সুবিচার রক্ষায় ঐতিহাসিক জি-আমর অভিযান, বনু নাজির অভিযান এবং বনু লাহয়ান অভিযান এই মাসেই সংঘটিত হয়েছিল।

গ. ১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার দ্বিপ্রহরে সূর্য ঢলে যাওয়ার পর ৬৩ বছর বয়সে নবুওয়াতের সূর্য মহানবী (সা.) ইহলোক ত্যাগ করেন। এই দিনে উম্মাহর জন্য আগমনের আনন্দ যেমন রয়েছে, তেমনই তাঁর চিরবিদায়ের গভীর বেদনাও জড়িয়ে রয়েছে এ মাসে।

নবীপ্রেম: ইমানের মূল ভিত্তি

ইসলামে নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাদিস শরিফে প্রিয় নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তানসন্ততি এবং সমগ্র মানবজাতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় হব।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার একমাত্র পথই হলো নবীজি (সা.)-এর জীবনাদর্শের পূর্ণ আনুগত্য। কোরআনের ভাষায়, ‘বলুন (হে রাসুল!), তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ করো; তবেই আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ৩১)

রবিউল আউয়ালের আহ্বান ও মুমিনের আমল

রবিউল আউয়াল মাস এলে মুমিনের হৃদয়ে নবীপ্রেমের নতুন স্পন্দন জাগে। কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এই মাসকে আত্মশুদ্ধি ও সুন্নতের অনুশীলনে রূপান্তর করাই মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। এ মাসে নবীজি (সা.)-এর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা, আইয়ামে বিজের (চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) নফল রোজা রাখা, বেশি বেশি তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজ আদায় এবং সর্বক্ষণ নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার দরুদ ও সালাম পেশ করা যেতে পারে।

রবিউল আউয়াল আমাদের ডাক দেয় নবীজি (সা.)-এর অনুপম চরিত্র—সততা, পরোপকার, ইনসাফ ও ক্ষমার আলোকে ব্যক্তি ও সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার। হে আল্লাহ, এই বরকতময় রবিউল আউয়ালে আমাদের অন্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সুন্নতের রঙে রাঙিয়ে দিন।