হোম > ইসলাম

ওয়াদিউল মুগাম্মাস

পবিত্র কাবা ধ্বংস করতে আসা হস্তীবাহিনীর পতন হয়েছিল যেখানে

ইসলাম ডেস্ক

মক্কা থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে অবস্থিত ওয়াদিউল মুগাম্মাস। ছবি: সংগৃহীত

মক্কা নগরী থেকে মাত্র তিন মাইল দূরের এক ঐতিহাসিক উপত্যকা ‘আল-মুগাম্মাস’। ইতিহাসের পাতায় এই স্থানটি চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। কারণ, এখানেই কাবা শরিফ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আসা আবরাহার হস্তীবাহিনী তাদের চূড়ান্ত ঘাঁটি গেড়ে ছিল। আর এখানেই ঘটেছিল অলৌকিক সেই ঘটনা—অসীম শক্তিশালী হাতি ‘মাহমুদ’ কাবাগৃহের দিকে এক পা-ও এগোতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

আল-মুগাম্মাসে আবরাহার অভিযান

ইয়েমেনের খ্রিষ্টান শাসক আবরাহা (যিনি আকসুম সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলেন) পবিত্র কাবাঘর ধ্বংস করার অশুভ উদ্দেশ্যে এক বিশালাকার সৈন্যবাহিনী ও ‘মাহমুদ’ নামের এক শক্তিশালী হাতি নিয়ে মক্কার দিকে রওনা হয়। যাত্রাপথে তায়েফবাসী আবরাহাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘আবু জুগাল’ নামের এক লোককে পাঠায়।

আবু জুগালের মৃত্যু ও পাথর নিক্ষেপের প্রথা

আবরাহার বাহিনী যখন আল-মুগাম্মাস উপত্যকায় পৌঁছায়, তখন পথপ্রদর্শক আবু জুগাল হঠাৎ মৃত্যুবরণ করে। আরবরা তাকে এই উপত্যকাতেই দাফন করে। এর পর থেকে পথচলতি মানুষের জন্য বিশ্বাসঘাতক আবু জুগালের কবরে ঘৃণা ভরে পাথর মারা একটি রীতিতে পরিণত হয়।

কুরাইশদের উট লুট

আল-মুগাম্মাস এলাকাটি তৎকালীন কুরাইশদের উট চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখানে পৌঁছানোর পর আবরাহা তার অগ্রবর্তী বাহিনীকে মক্কার উপকণ্ঠে পাঠিয়ে দেয়। তারা তিয়ামাহ ও কুরাইশদের বহু ধন-সম্পদ লুট করে। এর মধ্যে কুরাইশপ্রধান ও মহানবী (সা.)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিবের ২০০টি উটও ছিল।

আবরাহা ও আবদুল মুত্তালিবের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার

আবরাহা মক্কায় একজন দূত পাঠিয়ে বার্তা দেয়, সে মক্কাবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসেনি; তার একমাত্র উদ্দেশ্য কাবা ধ্বংস করা। মক্কাবাসী বাধা না দিলে কোনো রক্তপাত হবে না। বার্তা পেয়ে আবদুল মুত্তালিব আল-মুগাম্মাস উপত্যকায় আবরাহার তাঁবুতে যান। তবে তিনি কাবার নিরাপত্তার আকুতি না জানিয়ে কেবল তার আটক হওয়া ২০০টি উট ফেরত চান! আবরাহা এতে অবাক হলে আবদুল মুত্তালিব এক ঐতিহাসিক বাক্য উচ্চারণ করেন—‘আমি উটের মালিক, তাই উট ফেরত চাই। আর এই ঘরের (কাবার) একজন মালিক আছেন, তিনিই এটিকে রক্ষা করবেন।’

হাতি মাহমুদের অলৌকিক অবাধ্যতা

পরদিন সকালে আবরাহা তার হাতি ‘মাহমুদ’কে বাহিনীর সামনে রেখে কাবার দিকে মুখ করে দাঁড় করায়। কিন্তু হাতিটি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে এবং কাবার দিকে এক কদমও এগোতে রাজি হয় না। লোহার রড ও বড়শি দিয়ে আঘাত করার পরও হাতিটিকে সরানো যায়নি।

বিস্ময়কর বিষয় হলো, হাতিটিকে যখনই ইয়ামেন বা অন্য কোনো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হতো, সে সানন্দে হেঁটে চলত; কিন্তু কাবার দিকে মুখ করা মাত্রই সে থমকে যেত!

পাখির ঝাঁক ও আবরাহার বিনাশ

এর কিছুক্ষণ পরেই আসমান থেকে নেমে আসে ঐশ্বরিক গজব। সুরা ফিলে উল্লেখিত পাখির দল আবরাহার বাহিনীর ওপর কঙ্কর (ছোট ছোট পাথর) নিক্ষেপ করতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে আবরাহার পরাক্রমশালী বাহিনী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে ওই বছরকে ইতিহাসে ‘আমুল ফিল’ বা ‘হস্তী বর্ষ’ বলা হয়।