জর্ডান ঘুরে এসে
আমরা চলেছি জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে উত্তরের দিকে। প্রথমে ইরবিদ, তারপর আরও উত্তর-পশ্চিমে। প্রশস্ত পথ, গাড়ির গতি ঘণ্টায় ১৩০-এর কাঁটা ছুঁইছুঁই করছে। ইতিমধ্যে সূর্য হেলে পড়ায় রোদের তাপও কমে এসেছে। ঘণ্টা দেড়েক চলার পর গাড়ি এসে থামল সিরিয়া সীমান্তের কাছাকাছি পাহাড়ের মাথায় একটি খোলা প্রান্তরের সামনে। গাড়ি থেমে নেমে আড়মোড়া ভেঙে একটু সামনে এগিয়ে দেখি ফাঁকা মাঠের মধ্যে বিশাল আকারে ইংরেজি অক্ষরে ‘সাহাম’ লেখা। তার পাশে রকেটের মতো দেখতে একটি স্তম্ভ। আমাদের জর্ডানি মেজবান বন্ধু মোহাম্মদ নূর আলম বললেন, আরে এটাই তো ইয়ারমুকের যুদ্ধক্ষেত্র—দেখছেন না সামনে ইয়ারমুক নদীর গিরিখাত আর গোলান মালভূমি।
ইয়ারমুক যুদ্ধের গল্প সেই ছোটবেলায় ইতিহাস আর ধর্ম বইয়ে পড়েছি। আজ সেই প্রান্তরে এসে দাঁড়িয়েছি ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। চারপাশের পাহাড়, শুকনো মাটি, দূরে ছড়িয়ে থাকা পাথুরে প্রান্তর আর অদ্ভুত এক নীরবতা। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছু জায়গায় গেলে শুধু চোখ দিয়ে দেখা হয় না—ইতিহাস যেন এসে দাঁড়ায় চোখের সামনে। আমার মনে হলো ইয়ারমুক তেমনই এক জায়গা।
ভাবতেই পারছি না, আমি দাঁড়িয়ে আছি ইয়ারমুকের সেই ঐতিহাসিক প্রান্তরে, যেখানে ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত হয়েছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ, যার একদিকে ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী আর অন্যদিকে তৎকালীন মহাপরাক্রমশালী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিশাল বাহিনী।
ইয়ারমুকের যুদ্ধে কত মানুষ নিহত হয়েছিল, তার সঠিক হিসাব ইতিহাসে নেই। আরবি ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে বাইজেন্টাইন ও তাদের মিত্রদের নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার পর্যন্ত বলা হয়েছে। আধুনিক ইতিহাসবিদেরা অবশ্য এই সংখ্যা নিয়ে সন্দিহান। তাঁদের অনেকের ধারণা, নিহতের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারের কাছাকাছি হতেও পারে। আর মুসলিম বাহিনীর নিহতের সংখ্যা প্রচলিত হিসাবে চার হাজার বলেই ধরে নেওয়া হয়। তবে এই যুদ্ধেই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন আর আশপাশে ওড়ে ইসলামের বিজয় পতাকা।
আজ আমার চোখের সামনে কোনো সৈন্য নেই, নেই যুদ্ধের দামামা, নেই তরবারির ঝনঝন শব্দ। অথচ নীরবতার মধ্যেই যেন সেই যুদ্ধের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছিল, এই পাহাড়গুলো হয়তো দেখেছিল হাজার হাজার মানুষের ছুটে চলা; এই মাটিই হয়তো ধারণ করে আছে সেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মহান স্মৃতি।
আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছি, তার ঠিক পেছনেই ইসরায়েলের সীমান্তরক্ষীদের কড়া পাহারা। আমার এক দিকে সিরিয়া, লেবানন, অন্যদিকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সংযোগস্থল। আমি যেন ইতিহাসের ভেতরেই হাঁটছি।
ভালো করে তাকাই। উঁচু-নিচু পাথুরে জমি, গভীর খাদ, পাহাড়ের ঢাল আর বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর—সব মিলিয়ে কঠিন ভূপ্রকৃতি। দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালে বোঝা যায়, এখানে যুদ্ধ করা কতটা কঠিন ছিল। আজ যে পথ দিয়ে একজন পর্যটক ধীরে ধীরে হাঁটতে পারেন, একদিন সেই ভূখণ্ডেই সৈন্যদের জীবন-মৃত্যুর লড়াই চলেছিল।
কাছেই সিরিয়ার সীমান্ত। দূরে ইসরায়েল-অধিকৃত গোলান মালভূমির দিকের ভূপ্রকৃতিও চোখে পড়ে। মানচিত্রে যে সীমান্তগুলো কয়েকটি রেখা মাত্র, এই প্রান্তরে দাঁড়িয়ে সেগুলো যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে। একদিকে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতি, অন্যদিকে সপ্তম শতকের এক মহাযুদ্ধ—দুই সময় যেন একই দৃশ্যপটে এসে মিশে গেছে।
ভাবছিলাম, প্রায় চৌদ্দ শ বছর আগে এই একই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মানুষ কী দেখেছিল? কি ভয়, কি সাহস, কি অনিশ্চয়তা নিয়ে তারা এগিয়ে গিয়েছিল? যুদ্ধের ফল কী হবে, তা কি কেউ জানত? যারা শেষবারের মতো ঘর থেকে বেরিয়েছিল, তাদের কতজন আর ফিরে যেতে পারেনি?
ইয়ারমুকের যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; এর ফল মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয় সিরিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে মুসলিম শাসনের বিস্তারের পথ খুলে দিয়েছিল।
পুরোনো ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, সময় আসলে কত নির্মম। যে মানুষগুলো একদিন এই ভূখণ্ডের নিয়তি নির্ধারণের জন্য লড়াই করেছিলেন, তাঁদের কেউ নেই। তাঁদের অস্ত্র নেই, তাঁবু নেই, ঘোড়ার পদধ্বনি নেই। পড়ে আছে শুধু কিছু পাথর, কিছু ধ্বংসাবশেষ আর বিস্মৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা স্মৃতি।
হয়তো এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—মানুষ চলে যায়, সাম্রাজ্য চলে যায়, ক্ষমতার মানচিত্র বদলে যায়; কিন্তু কোনো কোনো মাটি মানুষের পদচিহ্ন ধরে রাখে।
ঘণ্টাখানেক পর চলে আসার সময় হলো। ফিরে আসার সময় বারবার পেছনে তাকাচ্ছিলাম। ইয়ারমুক তখনো নীরব। পাহাড়গুলোও নিশ্চুপ। বাতাস আগের মতোই বইছে। কিন্তু আমার ভেতরে তখন আর আগের সেই নীরবতা নেই। মনে হচ্ছিল, এই নীরব প্রান্তরের বুকের নিচে যেন ইতিহাস এখনো কথা বলে যাচ্ছে। যে কথা শুনতে পাচ্ছি না আমরা।