ইতিহাস, নন্দনতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিকতার মিলনমেলা—ইস্তাম্বুলের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা নীল মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে ‘সুলতান আহমেদ মসজিদ’ নামে পরিচিত, শত শত বছর ধরে উসমানীয় স্থাপত্যের আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দর্শনার্থীদের অভ্যর্থনা জানিয়ে আসছে।
উসমানীয় স্থাপত্যের প্রথম ছয় মিনারবিশিষ্ট মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত এবং ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক উপদ্বীপে ঐতিহ্যবাহী আয়া সোফিয়ার ঠিক বিপরীতে অবস্থিত এই চমৎকার মসজিদটি আজ থেকে ৪০৮ বছর আগে ইবাদতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল।
কম বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করা সুলতান প্রথম আহমেদ সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই মসজিদটি নির্মাণের নির্দেশ দেন। এর অনন্য স্থাপত্য, প্রতীকী উপাদান এবং নির্মাণের পেছনের ইতিহাস এটিকে এক বিশেষ তাৎপর্য দান করেছে।
১৬০৯ সালে তৎকালীন সেরা স্থপতিদের অন্যতম সেদেফকার মেহমেদ আগার তত্ত্বাবধানে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় সাত বছর পাঁচ মাস সময় লেগেছিল এর নির্মাণকাজ শেষ হতে। তুর্কি-ইসলামি সভ্যতার অন্যতম সেরা নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত এই মসজিদটি ১৬১৭ সালের ৯ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
এটি সেকালের অন্যতম বৃহৎ ‘কুল্লিয়ে’ (ইসলামি সামাজিক কল্যাণ কমপ্লেক্স) হিসেবেও পরিচিত ছিল। এর প্রাঙ্গণে ছিল মাদ্রাসা, রাজকীয় প্যাভিলিয়ন, বাজার, দোকানপাট, হামামখানা, ঝরনা, জনসাধারণের জন্য পানির প্রবৃত্তি, কবরস্থান, প্রাথমিক বিদ্যালয়, লঙ্গরখানা এবং ভাড়া দেওয়ার ঘর। অবশ্য এর কয়েকটি স্থাপনা কালের পরিক্রমায় বিলুপ্ত হয়েছে।
উসমানীয় মসজিদ স্থাপত্য ও বাইজেন্টাইন গির্জা স্থাপত্যের ২০০ বছরের মেলবন্ধনের সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে এই ব্লু মস্ক বা নীল মসজিদকে ক্ল্যাসিক্যাল উসমানীয় যুগের শেষ বিখ্যাত মসজিদ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
মসজিদের মূল প্রার্থনা কক্ষের ওপর শোভা পাচ্ছে ৪৩ মিটার (১৪১ ফুট) উঁচু এবং ২৩.৫ মিটার ব্যাসের একটি বিশাল কেন্দ্রীয় গম্বুজ। চারটি বিশাল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই গম্বুজটি ক্ল্যাসিক্যাল উসমানীয় স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম সেরা সাফল্য। কেন্দ্রীয় গম্বুজকে ঘিরে থাকা ছোট গম্বুজ ও খিলানগুলো কাঠামোর ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি ভেতরের পরিবেশকে করে তুলেছে উজ্জ্বল ও সুপরিসর।
মসজিদের ভেতরের সাজসজ্জা উসমানীয় শিল্প ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন। ইজনিক এবং কুতাহিয়া কারখানায় হাতে তৈরি মোট ২১ হাজার ৪৩টি সিরামিকের টাইলস কারুকাজের মতো চমৎকারভাবে এর ভেতরের দেয়ালে বসানো হয়েছে। মূলত এই নীলচে টাইলসের কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে এটি ‘ব্লু মস্ক’ বা ‘নীল মসজিদ’ নামে খ্যাতি লাভ করে। টাইলসগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে ক্ল্যাসিক্যাল উসমানীয় নকশা। আর মিহরাবের চারপাশের সোনালি কারুকাজ ও টাইলস তৎকালীন নন্দনতত্ত্বের সূক্ষ্ম পরিচয় বহন করে।
প্রায় ২৬০টি জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক আলো ভেতরে প্রবেশ করে টাইলসগুলোর ওপর প্রতিফলিত হয়, যা এক অপূর্ব রঙের খেলা তৈরি করে। মসজিদের দেয়ালের ক্যালিগ্রাফিগুলো এঁকেছেন দিয়ারবাকিরের বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার সাইয়েদ কাসিম গুবারি। নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর নীল মসজিদটি শুধু ইবাদতখানা নয়, সামাজিক জীবনেরও এক প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। চারপাশের মাদ্রাসা, স্কুল, হাসপাতাল, লঙ্গরখানা, বাজার ও ঝরনা সমন্বিত এই কমপ্লেক্স তৎকালীন নগর-পরিকল্পনা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়।
একসঙ্গে প্রায় ১২ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই মসজিদে গ্রীষ্মকালে দৈনিক গড়ে ২০ হাজার এবং শীতকালে প্রায় ১০ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। বসন্তকালে টিউলিপ ফুলে ঘেরা এই মসজিদের প্রাঙ্গণ যেন উসমানীয় যুগের সেই আভিজাত্যকে পুনরায় জীবন্ত করে তোলে। যুগের পর যুগ ধরে এক অবিচল মর্যাদায় ইস্তাম্বুলের প্রধান ল্যান্ডমার্ক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই মসজিদ।
ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে