হোম > ইসলাম

জীবনসংগ্রামে প্রশান্তির চাবিকাঠি কোরআনের যে ১০ আয়াত

ইসলাম ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

মানবজীবনে আনন্দ-বেদনা, আশা-প্রত্যাশা, ভয় ও ক্রোধের মুহূর্ত আসবেই। জীবনের একমাত্র নিশ্চয়তা হলো এর অনিশ্চয়তা, আর এই অনিশ্চিত যাত্রায় প্রকৃত প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা মেলে কেবল মহান আল্লাহর স্মরণে। ইসলামি জীবনদর্শনে ধৈর্য বা সবর অন্যতম ইবাদত, যার মাধ্যমে একজন মুমিন রবের সিদ্ধান্তের সামনে নিজেকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে।

বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রাখার গুরুত্ব বোঝাতে পবিত্র কোরআনে বারবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিরাত ও কোরআনের শিক্ষার আলোকে ধৈর্যের মাহাত্ম্য ও প্রতিদান নিয়ে বিশেষ ১০টি আয়াত নিচে আলোচনা করা হলো:

১. সৎকর্মশীলদের পুরস্কার বিফলে যায় না

ধৈর্য ধারণ করা নিজেই একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। যারা কষ্টের সময় অটল থাকে, পবিত্র কোরআনে তাদের প্রতিদান নিশ্চিত করেন: ‘ধৈর্য ধারণ করো (অটল থাকো); নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।’ (সুরা হুদ: ১১৫)

২. আল্লাহর সাহায্যই ধৈর্যের মূল উৎস

কঠিন মুহূর্তে ধৈর্য ধারণ করার শক্তি মানুষ নিজের চেষ্টা ছাড়াও আল্লাহর রহমতে লাভ করে: ‘ধৈর্য ধারণ করুন, আপনার ধৈর্য তো আল্লাহরই সাহায্যের মাধ্যমে। তাদের জন্য দুঃখ করবেন না এবং তাদের ষড়যন্ত্রে বিচলিত হবেন না।’ (সুরা নাহল: ১২৭)

৩. আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য

প্রতিকূল পরিবেশে ইমানের ওপর অবিচল থাকতে এই আয়াত মুমিনের হৃদয়ে পরম সাহস জোগায়: ‘অতএব ধৈর্য ধরুন। নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য, আর যারা বিশ্বাস করে না তারা যেন আপনাকে বিচলিত করতে না পারে।’ (সুরা রুম: ৬০)

৪. বিনয়ীদের জন্য ধৈর্য ও সালাত

যাদের অন্তরে খোদাভীতি ও বিনয় রয়েছে, তাদের জন্য ধৈর্য ধরা এবং সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া সহজ হয়: ‘ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো; অবশ্যই তা কঠিন, কিন্তু বিনয়ীদের জন্য নয়।’ (সুরা বাকারা: ৪৫)

৫. মহাভাগ্যের প্রতীক উত্তম চরিত্র

ধৈর্য কেবল সাধারণ সহ্যক্ষমতা নয়, এটি জীবনের অন্যতম সেরা মানবিক ও আধ্যাত্মিক গুণ অর্জন করতে সাহায্য করে: ‘কেবল তারাই এটি (উত্তম গুণ) লাভ করতে পারে যারা ধৈর্যের সঙ্গে অটল থাকে, কেবল তারাই এর অধিকারী হয় যারা মহাভাগ্যবান।’ (সুরা ফুসসিলাত: ৩৫)

৬. চূড়ান্ত সাফল্যের পূর্বশর্ত

ধৈর্য কোনো সাময়িক বিষয় নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি আত্মনিয়ন্ত্রণ, যা ইহকাল ও পরকালে সাফল্যের পথ প্রশস্ত করে: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধরো, ধৈর্যে অটল থাকো, একে অপরকে শক্তিশালী করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা আলে ইমরান: ২০০)

৭. আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই আছেন

বিপদের সময় মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হলো—সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং তাঁর পাশে রয়েছেন: ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না, নতুবা তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। ধৈর্য ধরো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনফাল: ৪৬)

৮. নবীগণের ঐতিহাসিক ধৈর্য ও দৃঢ়তা

ইতিহাসে যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় নবী ও অনুসারীরা যেসব কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা আমাদের ধৈর্যের অনুপ্রেরণা দেয়: ‘অনেক নবীই যুদ্ধ করেছেন এবং তাঁদের সঙ্গে অনেক আল্লাহভীরু লোক ছিল। আল্লাহর পথে তাদের ওপর যে বিপদ এসেছিল তাতে তারা সাহস হারায়নি, দুর্বল হয়নি এবং নতি স্বীকার করেনি। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৪৬)

৯. সংকল্প ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ

বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি বান্দার পূর্ণ আনুগত্য ও ইমানি দৃঢ়তা ফুটে ওঠে: ‘হে প্রিয় বৎস, নামাজ কায়েম করো, সৎকাজের আদেশ দাও, মন্দ কাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যা আপতিত হয় তাতে ধৈর্য ধরো। নিশ্চয়ই এটি দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ (সুরা লোকমান: ১৭)

১০. কঠিন পরীক্ষা ও ধৈর্যশীলদের জন্য জান্নাতি সুসংবাদ

জীবন হলো পরীক্ষার ক্ষেত্র। ধন-সম্পদ, জীবন বা ফসলের ক্ষতি হলে যারা আল্লাহর প্রতি সমর্পিত থাকে, তাদের জন্যই রয়েছে অফুরন্ত রহমত: ‘অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের। যারা বিপদে পড়লে বলে—“নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী...”’ (সুরা বাকারা: ১৫৫-১৫৭)

পৃথিবীর কোনো কষ্টই চিরস্থায়ী নয়। জীবনের যেকোনো আঁধার কাটিয়ে আলোর দিশা পেতে ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই। বিপদে বিচলিত না হয়ে নামাজ ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়াই একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।