হোম > ইসলাম

মাছের পেটে ইউনুস (আ.)-এর সেই রাত

ইফতেখারুল হক হাসনাইন

ছবি: সংগৃহীত

আল্লাহর নবী হজরত ইউনুস (আ.)-এর জীবনে ঘটা একটি অলৌকিক ঘটনা যুগে যুগে মানুষের চরম অসহায়ত্ব, তওবা ও আল্লাহর ওপর গভীর নির্ভরতার অনন্য শিক্ষা হিসেবে বিদ্যমান।

ইউনুস (আ.) নিনুওয়া শহরের অধিবাসীদের কাছে সুদীর্ঘকাল দাওয়াত পৌঁছে দেন। তবে তাঁর জাতি অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকে এবং ইসলামের বাণী গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। দীর্ঘদিনের বিফলতায় কষ্ট পেয়ে একপর্যায়ে তিনি আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ বা অনুমতির অপেক্ষা না করেই এলাকা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।

পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আর স্মরণ করো মাছওয়ালার (ইউনুস) কথা, যখন সে রাগান্বিত হয়ে চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল, আমি তার ওপর কোনো কষ্ট সৃষ্টি করব না।’ (সুরা আম্বিয়া: ৮৭)। মুফাসসিরদের মতে, তিনি নিজের জাতির অবাধ্যতায় ক্ষুব্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন, তবে আল্লাহর নির্দেশের আগে এলাকা ত্যাগ করায় তিনি একটি কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েন। (তাফসিরে ইবনে কাছির)

ঝড়ের রাতে নৌকায় লটারি ও সমুদ্রে নিক্ষেপ

এলাকা ছেড়ে ইউনুস (আ.) একটি যাত্রীবাহী নৌযানে উঠলেন। সেটি যখন সমুদ্রের মাঝপথে পৌঁছাল, তখন প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে। নৌযানটিকে ডুবুডুবু দশা থেকে বাঁচাতে যাত্রীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বোঝা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। যাত্রী কমানোর লক্ষ্যে লটারি করা হলে পরপর তিনবারই ইউনুস (আ.)-এর নাম উঠে আসে।

আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর সে লটারিতে অংশ নিল এবং পরাজিতদের অন্তর্ভুক্ত হলো।’ (সুরা সাফফাত: ১৪১)। বাধ্য হয়ে ইউনুস (আ.)-কে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরপরই আল্লাহর হুকুমে একটি বিশাল মাছ তাঁকে গিলে ফেলে। তবে আল্লাহর নির্দেশে মাছটি তাঁকে ভক্ষণ করেনি কিংবা তাঁর কোনো হাড়ও ভাঙেনি।

তিন অন্ধকারের মধ্য থেকে আকুল প্রার্থনা

রাতের অন্ধকার, সমুদ্রের তলদেশের অতল গহিন আর মাছের পেটের ভেতরকার অন্ধকার—এই তিন অন্ধকারের প্রকোষ্ঠে বন্দী হয়ে ইউনুস (আ.) নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। সেখান থেকে মানুষের কৌশলে উদ্ধার পাওয়ার কোনো পথ ছিল না।

চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি হয়ে তিনি পূর্ণ আন্তরিকতায় আল্লাহর দিকে ফিরে এলেন এবং মোনাজাত করলেন:

لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

(আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র ও মহান। নিশ্চয়ই আমি সীমা লঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি।) (সুরা আম্বিয়া: ৮৭)

এটি ছিল চরম আত্মসমর্পণের এক দোয়া। তিনি কোনো অনুযোগ না করে প্রথমেই আল্লাহর তাওহিদের ঘোষণা দিলেন, আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করলেন এবং সবশেষে নিজ ভুল স্বীকার করলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইউনুস (আ.)-এর এই দোয়া পাঠ করে কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা কবুল করেন। (জামে তিরমিজি: ৩৫০৫)

রহমতের বর্ষণ ও নিজ জাতির মাঝে প্রত্যাবর্তন

মাছের পেটে থাকা অবস্থায় ইউনুস (আ.)-এর কাতর তওবা কবুল হলো। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর আমি তার দোয়ায় সাড়া দিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করে থাকি।’ (সুরা আম্বিয়া: ৮৮)

আল্লাহ তাআলা ইউনুস (আ.)-কে মাছের পেট থেকে নির্জন তটে সুস্থ শরীরে বের হয়ে আসার তাওফিক দিলেন। তিনি তখন শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর ছায়ার জন্য সেখানে অলৌকিকভাবে একটি লতাগাছ উসকে দিলেন। সুস্থ হয়ে ওঠার পর আল্লাহ তাঁকে পুনরায় নিজ জাতির কাছে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

তত দিনে সেই নীনুওয়া শহরের মানুষেরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে খাঁটি মনে তওবা করে ইমান এনেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাকে এক লাখ বা তার চেয়েও বেশি মানুষের কাছে পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর তারা ইমান আনল, তাই আমি তাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগের সুযোগ দিলাম।’ (সুরা সাফফাত: ১৪৭-১৪৮)