হোম > ইসলাম

কোরআনের জীর্ণ কপি মেরামতে দিন কাটে ইমরানের

তাসনিফ আবীদ

পবিত্র কোরআনের জরাজীর্ণ পাতায় আলতো হাত বোলান তিনি। অক্ষরের প্রতি পরম মমতায় চোখে ভেসে ওঠে এক ঐশ্বরিক শ্রদ্ধা। তিনি পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির অধিবাসী হাফেজ ইমরান কুরাইশি। কোনো সরকারি অনুদান বা সংস্থার সাহায্য ছাড়া, স্রেফ নিজের ইচ্ছাশক্তি ও রবের প্রতি ভালোবাসাকে সম্বল করে চার বছর ধরে এক অনন্য অনুকরণীয় মিশনে নেমেছেন তিনি।

আজ থেকে চার বছর আগে তিনি ছিলেন পাকিস্তান পুলিশের কর্মকর্তা। কিন্তু কোরআনের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। জরাজীর্ণ ও পুরোনো কোরআনের কপি এবং পবিত্র কাগজগুলো যখন অবহেলায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, তখন তাঁর মন কেঁদে ওঠে। এই পবিত্র আমানত সংরক্ষণের নেশায় তিনি স্বাচ্ছন্দ্যের পুলিশ কর্মকর্তা পদটি থেকে পদত্যাগ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে হাফেজ ইমরান কুরাইশি জানান, ‘চার বছর আগে আমি জরাজীর্ণ ও পুরোনো কোরআন শরিফ সংগ্রহ করার কাজ শুরু করার সংকল্প করি। আর এই মহান কাজের তাগিদেই আমি পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিই। চার বছর ধরে নিয়মিত আমি এই কাজই করে যাচ্ছি।’

এই চার বছরের দীর্ঘ ও নিরলস পথচলায় তিনি এ পর্যন্ত দেড় লাখের বেশি পবিত্র কোরআনের পুরোনো ও জরাজীর্ণ কপি সংগ্রহ করেছেন।

কোরআন সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি বেশ সুসংগঠিত। তিনি ও তাঁর দল প্রথমে শহরের বিভিন্ন মসজিদে যান। মসজিদ কমিটির সঙ্গে কথা বলে জরাজীর্ণ কোরআন ও পবিত্র কাগজগুলো বাক্সে বন্দী করে রাখার অনুরোধ জানান। পরবর্তী দিন তিনি নিজের গাড়িতে করে সেই ভর্তি বাক্সগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন।

হাফেজ ইমরানের নিজস্ব একটি ছোট ব্যবসা রয়েছে। তাঁর সঙ্গে সাত-আটজন কর্মী কাজ করেন। সেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী দু-একজনকে সহায়তাকারী হিসেবে সঙ্গে নিয়ে তিনি শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কোরআনের কপি সংগ্রহে ঘুরে বেড়ান।

সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ কোরআনের কপি ও বাক্সগুলো নিরাপদে রাখার জন্য এগিয়ে এসেছেন তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বন্ধুটি তাঁর তিন-তিনটি দোকান এই পবিত্র কাজের উদ্দেশ্যে ওয়াক্ফ করে দিয়েছেন। সেখানেই আপাতত বস্তাবন্দী ও বাক্সে সংরক্ষিত পবিত্র কোরআনের কপিগুলো পরম যত্নে রাখা হয়।

তবে কেবল সংগ্রহ করেই হাফেজ ইমরানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। স্থানান্তরের পর প্রতিটি কপি খুব সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হয়। যে ক্যালিগ্রাফি বা পৃষ্ঠাগুলো সংস্কার বা বাঁধাই করা সম্ভব, তা নিজ খরচে মেরামত করেন তিনি। এরপর নতুন করে জীবন পাওয়া সেই সুবিন্যস্ত কোরআনের কপিগুলো বিনা মূল্যে বিতরণ করে দেওয়া হয় বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও সাধারণ মানুষের মাঝে।

অমর এই ভালোবাসার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইসলাম ও কোরআনের সম্মান রক্ষায় পদ-পদবি বা দুনিয়াবি মোহ কতটা অর্থহীন। হাফেজ ইমরান কুরাইশির এই আত্মত্যাগ ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা কেবল রাওয়ালপিন্ডির নয়, বরং সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুকরণীয় এক প্রেমের দৃষ্টান্ত।