হোম > বিশ্ব > যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

ইরানের হুমকি: তুরস্কে ক্যাটারিং ট্রাকে বিমানবন্দরে যান ট্রাম্প, বদল করেন উড়োজাহাজও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের হত্যার হুমকির পর গত মাসে তুরস্ক থেকে গোপন সামরিক ফ্লাইটে করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। অথচ হোয়াইট হাউস তখন জানিয়েছিল, তিনি এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে উড়ে যাচ্ছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গোপন অভিযানে প্রেসিডেন্টকে বিমানবন্দরের খাবার সরবরাহের একটি কার্টের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এমনকি তাঁকে বিমানবন্দরে স্থানান্তরের কাজে একটি ক্যাটারিং ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছিল।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্প যখন আঙ্কারায় ছিলেন, তখন এই অভিযান পরিচালিত হয়। টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে প্রেসিডেন্টকে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান নামের বিশাল উড়োজাহাজে উঠতে দেখা যায়। কিন্তু কয়েক মিনিট পর গোপনে তাঁকে একটি ছোট বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ কাজে বিমানবন্দরে ব্যবহৃত একটি ক্যাটারিং ট্রাক ব্যবহার করা হয়। এই ট্রাককে সাধারণত উড্ডয়নের আগে বিমানে খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম তোলার কাজে ব্যবহৃত হয়। এ তথ্য পোস্টকে জানিয়েছেন অভিযানের সঙ্গে পরিচিত এক মার্কিন কর্মকর্তা।

নিউইয়র্ক টাইমসকেও আরেক মার্কিন কর্মকর্তা এই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মন্তব্য চেয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তারা কোনো মন্তব্য করেনি।

ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান সাংবাদিকদের পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তার কাছ থেকেও গোপন রাখা হয়েছিল। পোস্টকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্রাম্পকে হত্যার একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি থেকেই এই ‘প্রতারণামূলক অভিযান’ শুরু হয়।

এর আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ৮ জুলাই ট্রাম্প পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানেই তুরস্ক ত্যাগ করেন। ট্রাম্প নিজেও তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ঘোষণা করেছিলেন যে, তুরস্কে যাওয়ার সময় যে নতুন বিমানটি ব্যবহার করেছিলেন, সেটিতে ফেরার বদলে তিনি ‘সাবেক এয়ার ফোর্স ওয়ান’ ব্যবহার করবেন। নতুন বিমানটি ছিল কাতারের উপহার দেওয়া একটি বোয়িং ৭৪৭-৮।

ন্যাটো সম্মেলনে যাওয়াই ছিল নতুন বিমানটির প্রথম আন্তর্জাতিক সফর। বিমানটির দ্রুতগতির সংস্কার নিয়ে এর ব্যয় ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠছিল। ইরানের সঙ্গে তুরস্কের সীমান্তও রয়েছে।

আঙ্কারা ছাড়ার আগে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, তিনি ‘পুরোনো দিনের কথা মনে করে’ পুরোনো, বেবি-ব্লু রঙের এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে ব্রিটেনের রয়্যাল এয়ার ফোর্স মাইল্ডেনহল ঘাঁটিতে যাবেন। একই সময়ে নতুন বিমানটিও ওই ঘাঁটিতে থামবে, যাতে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাসদস্যরা বিমানটি ঘুরে দেখতে পারেন।

আঙ্কারায় ক্যামেরার সামনে ট্রাম্প পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার পর তাকে গোপনে আরও ছোট একটি বিমানে, একটি মার্কিন এয়ার ফোর্স সি-৩২ এ-তে সরিয়ে নেওয়া হয়। পোস্টের প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত মার্কিন কর্মকর্তা এই অভিযানের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং পোস্ট যে তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করেছে, সেগুলোও ওই তথ্যকে সমর্থন করেছে।

পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পকে হত্যার একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকির কারণেই এই প্রতারণামূলক অভিযান শুরু হয়েছিল।

এর আগে ২০০০ সালেও একই ধরনের একটি অভিযান চালানো হয়েছিল। সে সময় প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন একটি চিহ্নহীন নির্বাহী জেটে করে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন, আর তার আনুষ্ঠানিক এয়ার ফোর্স ওয়ানকে ডিকয় বা বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

এবারের অভিযানে ট্রাম্পের সঙ্গে ভ্রমণ করছেন বলে মনে করা সাংবাদিকদের পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের প্রেস কেবিনের জানালার শেড বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পোস্ট জানিয়েছে, সাংবাদিকদের পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তাও বিশ্বাস করছিলেন যে প্রেসিডেন্ট ওই বিমানেই রয়েছেন। পরে সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন, কেন তাদের বিমানের জানালার শেড বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। জবাবে ট্রাম্প বলেন, তারা ‘সম্ভবত একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে’ ছিলেন। এরপর তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমি গেলে তোমরাও যাবে, তাই তো?’

ট্রাম্পকে বহনকারী সি-৩২এ বিমানটি ব্রিটেনের উদ্দেশে উড়ে যায় এবং স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১০টা ২০ মিনিটে সেখানে পৌঁছায়। পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান এবং গণমাধ্যমকর্মীদের বহনকারী দলটি তার কয়েক মিনিট পর সেখানে পৌঁছায়।

তবে সি-৩২এ থেকে ট্রাম্পকে কীভাবে আবার পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। কারণ ব্রিটেনে পৌঁছানোর পর তাকে ওই পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকেই নামতে দেখা যায়।

ট্রাম্পের সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের প্রেস পুল জানায়, স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে তিনি পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামেন। তিনি সাংবাদিকদের দিকে শান্তির প্রতীক হিসেবে দুই আঙুল তুলে ইশারা করেন, কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যাননি। এরপর কিছু সময় তিনি সেখানে থাকা মার্কিন সেনাসদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং পরে কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বিমানের দিকে হাঁটেন।

তৃতীয় একটি বিমানে ট্রাম্পের গোপন ফ্লাইটের খবর প্রকাশ্যে আসার পর এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস যোগাযোগ পরিচালক স্টিভ চিউংয়ের একটি বিবৃতি দেয়। চিউং বলেন, কাতারের উপহার দেওয়া বিমানটিতে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা প্রোটোকল স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যেমনটি বলেছেন, আমেরিকার অনেক শত্রু রয়েছে, যারা তাঁর ওপর নজর রেখেছে। আর আমরা এসব হুমকি মোকাবিলায় আমাদের হাতে থাকা প্রতিটি উপায় ব্যবহার করি।’