হোম > বিশ্ব > যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে কানাডার নতুন শুল্ক কার্যকর, আরও তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিনের দুই মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে ক্রমেই ক্ষতিকর হয়ে ওঠা বাণিজ্যযুদ্ধ আরও এক ধাপ এগিয়েছে। আজ মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর কানাডার নতুন শুল্ক আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, নতুন শুল্কের আওতায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্য। এর মধ্যে আছে—পোশাক, পনির, ধাতব যন্ত্রাংশ এবং কাঠজাত পণ্য। গত মাসে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা তীব্র বিরোধের মধ্যে ভেঙে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার ওপর যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, কানাডাও মূলত তারই অনুকরণে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে আপাতত পাল্টাপাল্টি শুল্কের অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। কারণ, নতুন শুল্ক যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে প্রতিবছর হওয়া মোট বাণিজ্যের তুলনায় মাত্র একটি ছোট অংশের ওপর কার্যকর হয়েছে। তবে আরও বড় উদ্বেগ হলো—এর ফলে পাল্টা প্রতিশোধের একটি চক্র শুরু হতে পারে। সেই চক্রে দুই দেশ আরও বেশি এবং আরও বিস্তৃত শুল্ক আরোপ করতে পারে, যা সীমান্তের দুই পাশের পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।

কানাডায় প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজেকে ট্রাম্পের বাণিজ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তিনি পরিস্থিতিকে এমনকি ‘যুদ্ধ’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। কানাডার কর্মকর্তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যত ডলারের শুল্ক আরোপ করবে, কানাডাও ‘ডলারের বিপরীতে ডলার’ ভিত্তিতে সমপরিমাণ শুল্ক আরোপ করবে।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা কানাডার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতার আকার নিয়েও বারবার ঠাট্টা করেছেন। ট্রাম্প ইতিমধ্যে কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এমনকি শুক্রবার তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করার চেষ্টা করতেও পারেন।

কানাডার নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও কানাডার বিরুদ্ধে আক্রমণ চালান। তিনি কানাডার বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারকে আলাদাভাবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ‘আর বোম্বার্ডিয়ার বিক্রি হবে না! এ সময় ট্রাম্প কানাডার বিরুদ্ধে ‘আমাদের মহান আমেরিকান ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোকে’ বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন ভোক্তাদের কিছু কানাডীয় পণ্য না কেনার আহ্বান জানান। ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমেরিকান পণ্য কিনুন। আমেরিকান বিমানে উড়ুন। আমেরিকান মদ ও পানীয় উপভোগ করুন। লেক আমেরিকায় নৌভ্রমণ করুন।’

হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে পাঠানো একটি অনুরোধের জবাব দেয়নি।

কানাডার সঙ্গে এই বিরোধ আরও একটি প্রমাণ দিয়েছে যে বাণিজ্য নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ চাপ প্রয়োগের কৌশল থেকে ট্রাম্প এখনও একটুও সরে আসেননি। প্রায় দুই বছর ধরে একের পর এক বড় আইনি পরাজয়, তীব্র আন্তর্জাতিক বিরোধ এবং দেশের ভেতরে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখেও শুল্কই রয়ে গেছে প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে পছন্দের হাতিয়ার। এর মাধ্যমে তিনি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে এবং অন্যদিকে আরও ভালো বাণিজ্য চুক্তি আদায় করতে চাইছেন।

ন্যাশনাল ফরেন ট্রেড কাউন্সিলের বাণিজ্য ও উদ্ভাবনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্র্যাড উড বলেন, ‘এই পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধ কানাডার ব্যবসা ও ভোক্তাদের জন্য খারাপ, একইভাবে আমেরিকান ব্যবসা ও ভোক্তাদের জন্যও খারাপ।’ ন্যাশনাল ফরেন ট্রেড কাউন্সিল একটি পলিসি বেজড বা নীতিভিত্তিক অ্যাডভোকেসি সংগঠন। এর পরিচালনা পর্ষদে ক্যাটারপিলার, এক্সন মোবিল, ফোর্ড মোটর এবং ওয়ালমার্টের মতো কোম্পানির প্রতিনিধিরা রয়েছেন। উড আরও বলেন, ‘প্রতিটি নতুন উত্তেজনা এমন একটি নতুন বাধা তৈরি করছে, যা শেষ পর্যন্ত কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রকে সমাধান করতে হবে।’

তিনি বলেন, এখন প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প তাঁর হুমকিগুলো বাস্তবে কার্যকর করবেন কি না।

যেভাবে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য বিরোধ

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাণিজ্য বিরোধ জুলাই মাসে প্রকাশ্য রূপ নেয়। সে সময় ট্রাম্প কানাডার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পগুলোর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ করেন। এর পর তিনি ঘোষণা দেন, দুই দেশ ৩০ দিনের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে কানাডার নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। দুই দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছিল। আগস্টের বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্পকে এমনকি বেশ আত্মবিশ্বাসীও মনে হয়েছিল যে একটি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।

কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমার আগেই আলোচনা ভেঙে যায়। উভয় পক্ষই একে অপরকে আলোচনার শেষ মুহূর্তে অযৌক্তিক দাবি তুলে সমঝোতার পথ নষ্ট করার জন্য দায়ী করে। এর পর আগস্টে ওয়াশিংটন কানাডার শত শত পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে। এর মধ্যে ছিল ওয়াইন, পনির, পোশাক এবং হকি স্টিক। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও অন্যান্য কানাডীয় কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তারা জানান, শ্রম দিবসের পর একই ধরনের পণ্যের ওপর কানাডাও শুল্ক আরোপ করবে।

এর পর থেকে মার্কিন কর্মকর্তারা একের পর এক হুমকি এবং প্রকাশ্য বিদ্রূপ করে আসছেন। এমনকি ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে অন্টারিও হ্রদের নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার উদ্যোগও নিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট কানাডার রাজনৈতিক নেতাদেরও আক্রমণ করেছেন। রোববার তিনি কানাডার মুদ্রা নিয়েও মন্তব্য করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার ডলারের ভারসাম্যহীনতা গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে এমনটাই হয়ে আসছে, কিন্তু আর নয়!’